ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ যতই সৌদি আরবের কাছাকাছি চলে আসছে, ততই নিজের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সাজাতে শুরু করেছে রিয়াদ। সেই প্রচেষ্টায় এবার সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুসলিম বিশ্বের দুই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক শক্তি পাকিস্তান ও তুরস্ক। শুক্রবার মক্কায় তিন দেশ এমন একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যার মূল বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিটির এই অংশই মধ্যপ্রাচ্যের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ সৌদি আরব বর্তমানে শুধু সরাসরি ইরানি হামলার ঝুঁকির মুখে নেই; ইরাক ও ইয়েমেনে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গড়ে ওঠা নতুন প্রতিরক্ষা কাঠামো রিয়াদের জন্য একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে এই চুক্তি এমন দুই দেশকেও সম্ভাব্যভাবে সংঘাতে টেনে আনতে পারে, যারা এতদিন ইরান যুদ্ধ থেকে সরাসরি দূরে থাকার চেষ্টা করেছে।
মক্কার চুক্তিতে কী বলা হয়েছে
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ বক্তব্য অনুযায়ী, এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করা। পাশাপাশি তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করার কথাও বলা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো একটি সদস্যরাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে গণ্য করার নীতি।
এই নীতি অনেকটাই ন্যাটো জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ধারণার সঙ্গে তুলনীয়। তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে হবে, কোন পরিস্থিতিকে সরাসরি আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে কিংবা সদস্যদেশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশিত বক্তব্যে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
ফলে চুক্তির রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হলেও এর সামরিক প্রয়োগের সীমা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
সৌদির জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তান ও তুরস্ক
সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে পাকিস্তান ও তুরস্ক—দুই দেশই মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের পর জোটটির দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক বাহিনী রয়েছে দেশটির। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র।
এ কারণে সৌদি আরবের সঙ্গে এই দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে শুধু একটি সাধারণ সহযোগিতা চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি রিয়াদের সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের হিসাবও আরও জটিল করে দিতে পারে।
বিশেষ করে সৌদি ভূখণ্ডে ভবিষ্যতে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করলে হামলাকারী পক্ষকে এখন শুধু সৌদি সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, পাকিস্তান ও তুরস্কের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও বিবেচনা করতে হতে পারে।
এই অনিশ্চয়তাই চুক্তিটির অন্যতম বড় প্রতিরোধমূলক শক্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিকল্প নিরাপত্তা কাঠামো
দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি, অস্ত্র সরবরাহ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর রিয়াদ বহু বছর ধরে নির্ভর করেছে।
তবে সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত উপসাগরীয় মিত্রদের কতটা এবং কীভাবে রক্ষা করবে—এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই পটভূমিতে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।
অর্থাৎ রিয়াদ ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে—বিষয়টি এমন নয়। বরং একটি মাত্র শক্তির ওপর নির্ভর না থেকে একাধিক সামরিক অংশীদারকে নিজের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতিতে এই কৌশলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এটি কি ইরানবিরোধী সামরিক জোট
চুক্তি ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এটি কি মূলত ইরানকে মোকাবিলা করার জন্য গড়ে ওঠা নতুন সামরিক জোট?
ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকালে এমন ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ ইরান যুদ্ধ সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। যুদ্ধ চলাকালে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে বেসামরিক অবকাঠামো, জ্বালানি স্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট স্বার্থও ছিল।
তবে তিন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে বলছে, চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে করা হয়নি।
এক তুর্কি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা কোনো বিশেষ পক্ষকে লক্ষ্য করে তৈরি নয়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, এটি নতুন কোনো সামরিক অক্ষ বা সাম্প্রদায়িক জোট গঠনের চেষ্টা নয়।
তারপরও বাস্তবতা হলো, বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে এই চুক্তির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়বে ইরানকে ঘিরে নিরাপত্তা হিসাবের ওপরই।
‘সুন্নি সামরিক ফ্রন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে কেন
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক—তিন দেশই মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। তাই একে কেউ কেউ শক্তিশালী সুন্নি-নেতৃত্বাধীন সামরিক প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবেও দেখছেন।
তবে এই ব্যাখ্যায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কারণ তিন দেশ নিজেরাই চুক্তিকে সাম্প্রদায়িক কাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে না। বিশেষ করে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও ইসলামাবাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তুরস্কের ক্ষেত্রেও সম্পর্কের হিসাব সরল নয়। তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যুতে প্রতিযোগিতা থাকলেও দুই দেশের কিছু অভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে আঙ্কারা ও তেহরানের নিজস্ব উদ্বেগ রয়েছে।
তাই পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদির নিরাপত্তায় যুক্ত হলেও তারা সরাসরি ইরানবিরোধী সর্বাত্মক সংঘাতে যেতে কতটা প্রস্তুত থাকবে, সেটি এখনো বড় প্রশ্ন।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের সীমান্ত
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়েরই ইরানের সঙ্গে স্থলসীমান্ত রয়েছে।
এ কারণে ইরানকে ঘিরে কোনো বড় সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে দুই দেশের জন্য পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের সামনে একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক রক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে।
তুরস্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ভারসাম্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও কোনো অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ তুরস্কের সীমান্ত নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক স্বার্থে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থাৎ মক্কার চুক্তি সৌদি আরবকে নিরাপত্তার বাড়তি নিশ্চয়তা দিলেও পাকিস্তান ও তুরস্কের সামনে নতুন কূটনৈতিক জটিলতাও তৈরি করেছে।
এপ্রিল ৮-এর যুদ্ধবিরতির পরও ঝুঁকি শেষ হয়নি
যুদ্ধ চলাকালে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে বারবার হামলা চালায়। তবে এপ্রিল ৮-এর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সৌদি আরবে সরাসরি ইরানি হামলা অনেকটাই কমে যায়।
কিন্তু তাতে রিয়াদের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
কারণ ইয়েমেন ও ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যেতে থাকে। এতে সৌদি নেতৃত্বের সামনে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়—শুধু ইরানের সরাসরি হামলা নয়, তেহরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডও বড় নিরাপত্তা হুমকি।
সৌদি আরব যুদ্ধটির অন্যতম জোরালো বিরোধী হিসেবেও অবস্থান নিয়েছে। রিয়াদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু একই সময়ে একাধিক দিক থেকে সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ায় দেশটির কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বেড়েছে।
বড় হামলার আশঙ্কায় ছিল রিয়াদ
চুক্তি স্বাক্ষরের ঠিক আগে বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা জানান, দেশটি বড় ধরনের সমন্বিত হামলার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
আশঙ্কা ছিল, ইরাক ও ইয়েমেনে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সহায়তায় সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বড় আক্রমণ চালাতে পারে।
এর পাশাপাশি তেহরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করেছে বলে জানানো হয়। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে পুরো অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা অথবা লবণাক্ত পানি পরিশোধন করে সুপেয় পানি তৈরির স্থাপনাগুলো প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্য হতে পারে—এমন বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য এই হুমকি অত্যন্ত গুরুতর।
কারণ এ অঞ্চলের অর্থনীতি যেমন জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি অনেক দেশের দৈনন্দিন পানির সরবরাহও সমুদ্রের পানি পরিশোধন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। ফলে এসব স্থাপনায় বড় ধরনের আঘাত শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, জনজীবনের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
তেহরানের উদ্দেশে সতর্কবার্তা
এই প্রেক্ষাপটে শুক্রবার মক্কায় স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিকে তেহরানের উদ্দেশে একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর মূল বার্তা হতে পারে—সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে বড় ধরনের হামলা হলে সেটি আর শুধু রিয়াদ ও হামলাকারী পক্ষের মধ্যে সীমিত সংঘর্ষ হিসেবে থাকবে না।
চুক্তি কার্যকর হলে পাকিস্তান ও তুরস্ককেও পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হতে হতে পারে। ফলে ছোট বা সীমিত আক্রমণ দ্রুত বড় আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এই সম্ভাবনাই হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিপক্ষকে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
অন্যদিকে এখানেই চুক্তিটির সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও রয়েছে। সম্মিলিত প্রতিরক্ষা প্রতিপক্ষকে হামলা থেকে বিরত রাখতে পারে, কিন্তু কোনো সদস্যরাষ্ট্র সত্যিই বড় হামলার শিকার হলে একই ব্যবস্থা সংঘাতকে দ্রুত আরও বিস্তৃতও করতে পারে।
ইরানের অসন্তোষ প্রকাশ
মক্কার চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে নেয়নি তেহরান।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগুজে চুক্তি সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।
তিনি আরও ইঙ্গিত করেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কয়েক দশকের নির্ভরতাও যেভাবে রিয়াদের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি, নতুন এই চুক্তিও একইভাবে স্থায়ী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।
ইরানের এই প্রতিক্রিয়া দেখায়, তেহরান চুক্তিটিকে নিছক নিয়মিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা হিসেবে দেখছে না। বরং সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচনা করছে।
আরও দেশ যুক্ত হতে পারে
চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য দিয়েছেন এক তুর্কি কর্মকর্তা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আঞ্চলিক অন্য দেশগুলোর জন্যও এই ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
যদি ভবিষ্যতে আরও দেশ এতে যোগ দেয়, তাহলে তিন দেশের বর্তমান সমঝোতা একটি বড় আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামোয় রূপ নিতে পারে।
তখন এর প্রভাব শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া এবং মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সম্পর্কেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে নতুন সদস্য নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক অংশীদারত্ব এবং নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইসরায়েলের সামরিক বিস্তারও একটি বড় প্রেক্ষাপট
নতুন চুক্তির পেছনের আঞ্চলিক বাস্তবতা শুধু ইরানকে ঘিরে নয়।
এ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের সামরিক প্রভাবও বিস্তৃত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে।
ফলে রিয়াদ এমন এক সময়ে নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো মিত্রতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনেক সমীকরণই নতুন করে সাজানো হচ্ছে।
এ অবস্থায় পাকিস্তান ও তুরস্ককে সৌদির পাশে আনাকে শুধু তাৎক্ষণিক ইরানি হুমকির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। এটি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে রিয়াদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির অংশও হতে পারে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন নয়
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বহুদিনের।
গত সেপ্টেম্বরেই দুই দেশ একটি আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। সেটি হয়েছিল ইরান সৌদি ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা শুরু করারও আগে।
তাই শুক্রবারের নতুন চুক্তি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো সম্পর্ক নয়। বরং আগে থেকেই গড়ে ওঠা সামরিক সহযোগিতাকে তুরস্কের অংশগ্রহণের মাধ্যমে আরও বড় ও বহুপক্ষীয় কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ।
তুরস্কের অংশগ্রহণ এই ব্যবস্থার সামরিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যুদ্ধ শুরু হলে কে কত দূর যাবে
চুক্তির ভাষা শক্তিশালী হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
ধরা যাক, সৌদি আরবের কোনো স্থাপনায় আবার বড় ধরনের হামলা হলো। তখন কি পাকিস্তান সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবে? তুরস্ক কি নিজস্ব বাহিনী পাঠাবে? নাকি সহযোগিতা গোয়েন্দা তথ্য, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, আকাশ প্রতিরক্ষা অথবা কূটনৈতিক সহায়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
প্রকাশিত যৌথ বক্তব্যে এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।
এই অস্পষ্টতা উদ্দেশ্যমূলকও হতে পারে। কারণ প্রতিপক্ষ ঠিক জানে না কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে—এমন অনিশ্চয়তা অনেক সময় প্রতিরোধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে।
কিন্তু বাস্তবে কোনো সংকট শুরু হলে একই অস্পষ্টতা সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্যের কারণও হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত
মক্কার এই প্রতিরক্ষা চুক্তি এমন এক সময়ে স্বাক্ষরিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধ, ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা, ইসরায়েলের বিস্তৃত সামরিক তৎপরতা, উপসাগরীয় দেশগুলোর পারস্পরিক টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে পুরোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব একটি নতুন বার্তা দিচ্ছে—নিজের নিরাপত্তার জন্য শুধু একটি বৈশ্বিক শক্তির ওপর নির্ভর না করে মুসলিম বিশ্বের সামরিকভাবে সক্ষম দেশগুলোকেও পাশে রাখতে চায় রিয়াদ।
পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং তুরস্কের বড় ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক শক্তি তৈরি করতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এই জোটের সামনে কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক উভয়ই ইরানের প্রতিবেশী। দুই দেশই চায় না এমন কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে, যা তাদের নিজস্ব সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে বিপদে ফেলবে।
ফলে মক্কার চুক্তির আসল গুরুত্ব বোঝা যাবে তখনই, যখন কোনো বাস্তব নিরাপত্তা সংকটে তিন দেশকে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এ মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, চুক্তিটি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সমীকরণে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি আরব এখন সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছে—ভবিষ্যতের বড় কোনো হামলার হিসাব শুধু রিয়াদের সামরিক সক্ষমতা বিবেচনা করে করা যাবে না।
সেই হিসাবের সঙ্গে এখন পাকিস্তান ও তুরস্ককেও যোগ করতে হবে।
আর ইরান যুদ্ধ যতদিন আঞ্চলিক দেশগুলোর সীমান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দিকে এগিয়ে থাকবে, ততদিন মক্কার এই চুক্তি শুধু কূটনৈতিক দলিল নয়—মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য পরবর্তী সামরিক অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেই আলোচনায় থাকবে।

