ইসরায়েলকে মুসলিম বিশ্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে দেশটির বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। একই সঙ্গে ইসরায়েলকে মোকাবিলায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন তিনি।
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সইয়ের পরদিন একটি পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব মন্তব্য করেন খাজা আসিফ। তাঁর বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইসরায়েল প্রসঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, মুসলিম দেশগুলোর এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলকে ঘিরে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা ছাড়া পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন।
খাজা আসিফ ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়েও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের জন্ম বেলফোর ঘোষণার ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৪০-এর দশকে একটি রাষ্ট্র হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা হয়।
১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার ইহুদিদের জন্য একটি পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বেলফোর ঘোষণা দেয়। পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
খাজা আসিফের বক্তব্যে শুধু ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের সমালোচনাই নয়, দেশটির সামগ্রিক নীতির প্রতিও গভীর আপত্তি প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর মতে, ইসরায়েলের নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও ফিলিস্তিন ও মুসলিম বিশ্বের প্রতি দেশটির নীতিতে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নির্বাচনে পরাজিত হলেও ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জেরুজালেমের ক্ষমতায় কে থাকছেন, সেটি একমাত্র বিষয় নয়; ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই মূল প্রশ্ন।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান নিতে হবে। তাঁর অভিযোগ, ইসরায়েল বিভিন্ন মুসলিম দেশের মধ্যে বিভাজন ও বিরোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
খাজা আসিফের বক্তব্যের বিষয়ে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টেও ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন পাকিস্তানের এই মন্ত্রী। পরে অবশ্য সেই পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
পাকিস্তান ও ইসরায়েলের মধ্যে এখনো কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। পাকিস্তান ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়নি। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল পাকিস্তান।
ইসলামাবাদের অবস্থান হলো, পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে ১৯৬৭ সালের আগের সীমানার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
২০১৮ সালে ভারত সফরের সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবশ্য বলেছিলেন, ইসরায়েল পাকিস্তানের শত্রু নয় এবং পাকিস্তানেরও ইসরায়েলের শত্রু হওয়া উচিত নয়। তবে এরপরও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের সময়টিও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর ঠিক আগের দিন পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। নতুন এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে ঘিরে তিন দেশের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান শনিবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, নতুন চুক্তিটি কৌশলগত দিক থেকে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনীয়। অর্থাৎ তিন দেশের যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে সেটিকে বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
ফিদানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই সহযোগিতার আওতায় ন্যাটোর আদলে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবে একটি সাধারণ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কথাও ভাবা হচ্ছে।
এই জোটে মিসরের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, কিছু কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত করা সম্ভব হলে মিসরও এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হতে পারে।
ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দুটি বিষয় পাশাপাশি সামনে এসেছে—একদিকে ইসরায়েলকে ঘিরে পাকিস্তানের কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান, অন্যদিকে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ।
তবে এই নতুন জোট ভবিষ্যতে ঠিক কোন ধরনের সামরিক ও কৌশলগত ভূমিকা পালন করবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে এটি কেবল পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে—সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একই সঙ্গে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান না হলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অন্তত সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

