যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রপতির জন্য আন্তর্জাতিক সংকট এবং ঘরের অর্থনৈতিক দুর্বলতা একই সময়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠলে পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলে যেতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বর্তমান পর্যায়ে ঠিক সেই ধরনের একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে ইরান ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দীর্ঘায়িত অচলাবস্থা, অন্যদিকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের দুর্বল চিত্র এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ—এই দুই সংকট এখন একে অপরকে আরও জটিল করে তুলছে।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই এই পরিস্থিতি রিপাবলিকান দলের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে পিছু হটাতে চাইলেও তেহরান এখন পর্যন্ত এমন কোনো অবস্থানে যায়নি, যেখান থেকে দ্রুত সমঝোতার স্পষ্ট পথ দেখা যায়। বরং হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
এই কারণেই বর্তমান সংকটকে ঘিরে জিমি কার্টারের সময়কার ইরান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা সামনে আসছে।
কার্টারের সময়ের স্মৃতি কেন ফিরে আসছে
1979-80 সালের ইরান জিম্মি সংকট যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। তখন তেহরানে 52 জন মার্কিন নাগরিককে জিম্মি করা হয়েছিল। সেই সংকট শেষ পর্যন্ত 444 দিন স্থায়ী হয়।
রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টারের জন্য ঘটনাটি শুধু পররাষ্ট্রনীতির সংকট ছিল না। সময়ের সঙ্গে এটি তার নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল। 25 এপ্রিল, 1980 সালে ব্যর্থ উদ্ধার অভিযানের পর কার্টারকে জাতির উদ্দেশে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছিল। সেই ঘটনাও তার রাজনৈতিক দুর্বলতার প্রতীকে পরিণত হয়।
46 বছর পর পরিস্থিতি অবশ্য এক নয়। এখন ইরানের হাতে মার্কিন নাগরিক জিম্মি নেই। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তেহরান এমন একটি অর্থনৈতিক কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে, যার প্রভাব সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। ফলে সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা থাকলে তার প্রতিফলন জ্বালানির বাজারে পড়াই স্বাভাবিক। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে পেট্রোলের গড় দাম আবার প্রতি গ্যালনে $4-এর ওপরে উঠেছে বলে এএএ-এর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সমস্যাটি এখানেই। ভোটারদের কাছে ইরান কতটা সামরিকভাবে দুর্বল হয়েছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পেট্রোলের জন্য কত টাকা দিতে হচ্ছে—এই প্রশ্নটি অনেক বেশি তাৎক্ষণিক।
শক্তিশালী হয়েও কেন অস্বস্তিতে ওয়াশিংটন
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হচ্ছে, ইরানের ওপর সামরিক এবং অর্থনৈতিক চাপ শেষ পর্যন্ত কাজ করবে। গত বছরের বিমান হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পিছিয়ে গেছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাও আঘাত পেয়েছে—এমনটাই প্রশাসনের অবস্থান।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য এক বিষয়, আর রাজনৈতিক সমঝোতার টেবিলে ফল পাওয়া আরেক বিষয়।
এক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা আসন্ন বলে আশাবাদ দেখিয়েছিলেন। এরপর পরিস্থিতি সহজ হওয়ার বদলে ইরান নতুন ও কঠিন শর্ত সামনে এনেছে।
তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেওয়া, অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
এ ধরনের শর্ত সরাসরি মেনে নেওয়া ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত কঠিন। কারণ তিনি যদি এগুলো গ্রহণ করেন, তাহলে বিরোধীরা সেটিকে ইরানের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
অন্যদিকে তিনি যদি আবার পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতে ফিরে যান, তাহলেও ঝুঁকি কম নয়। নতুন করে যুদ্ধ তীব্র হলে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে এবং এমন একটি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যেতে পারে, যার প্রতি সাধারণ ভোটারের সমর্থন সীমিত।
অর্থাৎ ট্রাম্প এমন একটি অবস্থানে পৌঁছেছেন, যেখানে দ্রুত সমঝোতা তার জন্য কঠিন, আবার নতুন করে সংঘাত বাড়ানোও ব্যয়বহুল।
ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র কি সময়?
তেহরানের জন্য বর্তমান পরিস্থিতিতে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্পের সামনে নভেম্বরের নির্বাচন রয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ দ্রুত কমানো তার রাজনৈতিক স্বার্থে জরুরি। কিন্তু ইরানের নেতৃত্বের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই ধরনের নির্বাচনী সময়সীমা নেই।
এখানেই দুই পক্ষের হিসাব আলাদা।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ দীর্ঘ হলে ইরানের জন্য তা সহ্য করা কঠিন হবে। অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব অতীতেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
9 আগস্ট, রোববার অ্যাক্সিওসকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প জানান, তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসন আপাতত পরিস্থিতিকে তুলনামূলক নিচু মাত্রায় রেখেছে এবং আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ না করলেও পূর্ণমাত্রায়ও এগোচ্ছে না।
এ থেকে বোঝা যায়, ট্রাম্পের বর্তমান কৌশলের বড় অংশ নির্ভর করছে এই ধারণার ওপর যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরান অর্থনৈতিক চাপ কম সময় সহ্য করতে পারবে।
কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতির প্রশ্নে সমস্যাটি হচ্ছে—ট্রাম্পের হাতে অপেক্ষা করার সময় সীমিত।
যুদ্ধের প্রভাব এখন আমেরিকানদের পকেটে
ইরান সংকটের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং জ্বালানির পাম্প, বাজার, বাড়িভাড়া এবং পরিবারের মাসিক খরচের হিসাবের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ভোটারদের একটি বড় অংশ আগে থেকেই খাদ্য, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ আরও গভীর হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন।
কারণ সরকারি পরিসংখ্যানে অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক দিক থাকতে পারে, কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যদি বাজারে গিয়ে বেশি দাম দেন, বাড়িভাড়া দিতে হিমশিম খান কিংবা চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে তিনি সরকারি আশাবাদী বক্তব্যের সঙ্গে নিজের বাস্তবতার মিল খুঁজে পান না।
ট্রাম্প প্রশাসন এখন ঠিক এই সমস্যার মুখোমুখি।
জুলাইয়ে 23,000 চাকরি কমা কেন বড় ধাক্কা
শুক্রবার প্রকাশিত সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে 23,000 চাকরি কমেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এ ধরনের পরিসংখ্যান রিপাবলিকানদের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ বিরোধীরা সহজেই এটিকে অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য অর্থনীতিকে দুর্বল বলতে রাজি নয়।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের পরিচালক কেভিন হ্যাসেটের দাবি, সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। তিনি চাকরি কমার পেছনে সাময়িক কিছু কারণের কথা বলেছেন। তার মতে, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অস্থায়ী কাজ শেষ হওয়া এবং জুলাই মাসে শিক্ষকদের কর্মবিরতির মতো মৌসুমি কারণ চাকরির সংখ্যায় প্রভাব ফেলেছে।
তিনি আরও দাবি করেছেন, অর্থনীতি ভালো মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং বিভিন্ন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গতিও ধীরে ধীরে কমছে।
কিন্তু অর্থনৈতিক রাজনীতিতে শুধু সরকারি তথ্য যথেষ্ট নয়। মানুষ নিজের জীবনে কী অনুভব করছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত ভোটের আচরণে বড় ভূমিকা রাখে।
‘অর্থনীতি ভালো’ বললেই কি ভোটার বিশ্বাস করবে?
ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর একটি পুরোনো সমস্যা হলো—তারা প্রায়ই সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচক দেখে আশাবাদী হয়, কিন্তু ভোটাররা অর্থনীতিকে বিচার করেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।
এই পার্থক্য রাজনৈতিকভাবে বহুবার বিপজ্জনক হয়েছে।
2008 সালে জন ম্যাককেইনের নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক বার্তা ঠিকভাবে সামলাতে না পারা সমস্যা তৈরি করেছিল। 2010 সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বারাক ওবামার সময় ডেমোক্র্যাটরাও অর্থনৈতিক অসন্তোষের মূল্য দিয়েছিল। আবার 2024 সালে জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের রাজনৈতিক ব্যর্থতার পেছনেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভোটারদের অর্থনৈতিক হতাশা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছিল।
ট্রাম্প এখন একই ধরনের পরীক্ষার মুখে।
প্রশাসন যদি ক্রমাগত বলে অর্থনীতি খুব ভালো চলছে, কিন্তু মানুষ নিজের দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন না দেখে, তাহলে সেই বক্তব্য আশ্বস্ত করার বদলে উল্টো ক্ষোভ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা নিয়েও প্রশ্ন
এই অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু পোস্ট তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নতুন সমালোচনার সুযোগ দিয়েছে।
তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ গ্যারি প্লেয়ারের সঙ্গে নিজের ছবি প্রকাশ করেছেন। নিজের একটি ক্রীড়াক্ষেত্রে নতুন সবুজ অংশ তৈরির ছবিও দিয়েছেন।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির বাসভবনে প্রস্তাবিত নতুন নৃত্যকক্ষের সঙ্গে ভবিষ্যৎ মানববিহীন উড়োজাহাজ অবতরণের স্থান, প্রতিফলন পুকুরের সংস্কার এবং ওয়াশিংটনের দুটি ভাস্কর্যে চকচকে সোনালি আবরণ দেওয়ার বিষয়েও তিনি পোস্ট করেছেন।
সমস্যা হচ্ছে, এমন সময়ে এসব বিষয় সামনে এসেছে যখন সাধারণ মানুষের একটি অংশ পেট্রোল, খাদ্য, বাড়ি এবং চাকরির খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন।
ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সহজেই এমন একটি বর্ণনা দাঁড় করাতে পারে যে রাষ্ট্রপতি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগের চেয়ে নিজের স্থাপত্য ও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার নিয়ে বেশি ব্যস্ত।
নির্বাচনের আগে ভাবমূর্তির রাজনীতিতে এ ধরনের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু সাফল্য আছে, কিন্তু ভোটে কতটা কাজে আসবে?
ট্রাম্পের জন্য আগস্ট মাস পুরোপুরি ব্যর্থও নয়।
তার সাবেক ব্যক্তিগত আইনজীবী টড ব্লাঞ্চকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে সিনেট অল্প ব্যবধানে অনুমোদন দিয়েছে। এটি ট্রাম্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সাফল্য।
তবে প্রশ্ন হলো, সাধারণ ভোটারের কাছে এ সাফল্যের গুরুত্ব কতটা।
একজন ভোটার যদি জীবনযাত্রার ব্যয়, চাকরি বা জ্বালানির দাম নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তাহলে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের একটি নিয়োগ তার ভোটের সিদ্ধান্তে খুব বেশি প্রভাব ফেলবে না।
একই সময়ে ট্রাম্পের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ভোটসংক্রান্ত বিধিনিষেধের প্রস্তাবও রিপাবলিকানদের প্রত্যাশামতো এগোতে পারেনি।
পররাষ্ট্রনীতিতেও আরেকটি অস্বস্তিকর ঘটনা ঘটেছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় হামাসকে নিরস্ত্র করার পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে যেটি উপস্থাপন করা হচ্ছিল, সেটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তায় পুরোনো সুবিধা হারাচ্ছে রিপাবলিকানরা?
একাধিক সাম্প্রতিক জনমত জরিপে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রিপাবলিকান দলের ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক সুবিধা দুর্বল হয়েছে।
এটি ট্রাম্পের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
2016 এবং 2024 সালের নির্বাচনে তার বড় শক্তি ছিল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরের একজন বিদ্রোহী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা। তিনি এমন একজন রাজনীতিকের ভাবমূর্তি গড়েছিলেন, যিনি প্রচলিত নিয়ম ভাঙবেন এবং ওয়াশিংটনের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবেন।
কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।
ট্রাম্প নিজেই ক্ষমতার কেন্দ্রে। ফলে তিনি আর শুধু বাইরের ব্যবস্থাকে দোষ দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে পারেন না। তাকে নিজের প্রশাসনের ফলাফলও ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে।
2018 ও 2020 সালের নির্বাচনে নিজের শাসনামলের রেকর্ড রক্ষা করতে গিয়ে তিনি আগের মতো রাজনৈতিক সুবিধা পাননি। বর্তমান মধ্যবর্তী নির্বাচনেও সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি রয়েছে।
গত সপ্তাহে পাঞ্চবোল নিউজকে ট্রাম্প বলেন, মানুষ তার ওপর ক্ষুব্ধ নয়, বরং রিপাবলিকানদের ওপর ক্ষুব্ধ।
কিন্তু ভোটের ফলাফলে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রপতি এবং তার দলকে সব সময় আলাদা করে দেখে না। ক্ষমতাসীন দলের সাফল্য যেমন রাষ্ট্রপতির কৃতিত্ব হিসেবে দেখা হয়, ব্যর্থতার দায়ও শেষ পর্যন্ত তার ওপর এসে পড়তে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের ভুল কি ট্রাম্পকে বাঁচাতে পারে?
ট্রাম্পের সমস্যার অর্থ এই নয় যে ডেমোক্র্যাটদের জন্য নভেম্বরের নির্বাচন সহজ হয়ে গেছে।
বরং সাম্প্রতিক কিছু প্রার্থী বাছাই রিপাবলিকানদের নতুন রাজনৈতিক সুযোগ দিতে পারে।
ডেমোক্র্যাট দলের ভেতরে প্রগতিশীল এবং গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রার্থীদের বেশ কিছু প্রাথমিক নির্বাচনী সাফল্য ট্রাম্পকে পুরোনো একটি রাজনৈতিক কৌশল নতুন করে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। তিনি দাবি করতে পারেন যে তিনি অতিবাম রাজনৈতিক প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।
এর সঙ্গে অতীতের রিপাবলিকান দলের চা-দলীয় বিদ্রোহের একটি মিল রয়েছে।
দলের তৃণমূল ভোটারদের অত্যন্ত পছন্দের কোনো প্রার্থী সাধারণ নির্বাচনে মধ্যপন্থী ও শহরতলির ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারেন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা এমন কিছু আসন ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, যেখানে তুলনামূলক মধ্যপন্থী প্রার্থী জয়ের বেশি সুযোগ পেতেন।
অন্যদিকে প্রগতিশীলদের যুক্তি ভিন্ন।
তাদের ধারণা, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু ট্রাম্পবিরোধিতা যথেষ্ট নয়। এমন ভোটারও রয়েছেন, যারা ট্রাম্পকে পছন্দ করেন না কিন্তু একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাট দলের প্রচলিত নেতৃত্বের প্রতিও বিরক্ত।
জো বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের 2024 সালের ব্যর্থতার পর এই অংশের ভোটারদের কাছে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বার্তার চাহিদা তৈরি হয়েছে বলেই প্রগতিশীলরা মনে করছেন।
মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদের কৌশল
মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে প্রগতিশীল প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের উত্থান এই বিতর্ককে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
18 জুলাই ডেট্রয়েটে এক সমাবেশে তাকে রাজ্যের প্রতিনিধি ডোনাভান ম্যাককিনি, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, বার্নি স্যান্ডার্স, ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্সের সভাপতি শন ফেইন এবং রাশিদা তালিবের সঙ্গে দেখা গেছে।
রোববার সিএনএনের জেক ট্যাপারের সঙ্গে আলোচনায় এল-সায়েদ দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনের তিক্ততা সরিয়ে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে সামনে আনার চেষ্টা করেন।
তার মূল রাজনৈতিক যুক্তি ছিল, ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন এবং সাধারণ পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রশ্ন অনেক বড়।
মিশিগানের মতো একটি অঙ্গরাজ্যে এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, সেটি নির্ধারণে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য বড় ভূমিকা রাখবে।
ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি সম্ভাব্য পথ
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সামনে মোটামুটি তিন ধরনের পথ দেখা যাচ্ছে।
প্রথমত, ইরানের সঙ্গে এমন একটি সমঝোতা করা, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং জ্বালানির দাম কমতে শুরু করবে। নির্বাচনী রাজনীতির জন্য এটিই তার সবচেয়ে সুবিধাজনক ফল হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখে অপেক্ষা করা, যতক্ষণ না ইরান নিজের অবস্থান নরম করতে বাধ্য হয়। এটিই এখন ট্রাম্পের প্রধান কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
তৃতীয়ত, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবার সামরিক অভিযান বাড়ানো।
শেষ পথটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী হলেও নতুন সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং ভোটারদের মধ্যে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়াতে পারে।
কার হাতে বেশি সময়, সেটিই কি শেষ পর্যন্ত নির্ধারক?
এই সংকটের মূল প্রশ্ন হয়তো শুধু কে বেশি শক্তিশালী, সেটি নয়। বরং কে বেশি সময় অপেক্ষা করতে পারে।
সামরিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক আকার এবং বৈশ্বিক প্রভাবের বিচারে যুক্তরাষ্ট্র নিঃসন্দেহে ইরানের তুলনায় অনেক বড় শক্তি। কিন্তু নির্বাচনী গণতন্ত্রে একজন রাষ্ট্রপতিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফল দেখাতে হয়।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে নভেম্বরের নির্বাচন সেই সময়সীমা নির্ধারণ করছে।
ইরান যদি মনে করে যে কয়েক মাসের অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব, তাহলে তেহরানের পক্ষে সময়ক্ষেপণই একটি কার্যকর কৌশল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প আশা করছেন, অবরোধের অর্থনৈতিক ক্ষতি এতটাই তীব্র হবে যে ইরানের নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই আলোচনায় নমনীয় হতে বাধ্য হবে।
এই দুই হিসাবের মধ্যে যে পক্ষ ভুল করবে, তার মূল্য অনেক বড় হতে পারে।
ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো যুদ্ধ নয়, মানুষের উপলব্ধি
ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন যে তার অর্থনৈতিক নীতি সফল হচ্ছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী।
কিন্তু রাজনীতিতে একটি কঠিন সত্য রয়েছে—অর্থনীতি কাগজে কেমন, তার চেয়ে ভোটারদের কাছে অর্থনীতি কেমন মনে হচ্ছে, সেটিই অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ যদি নিজের আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারেন, বাড়ির খরচ সামলাতে সমস্যায় পড়েন কিংবা প্রতিদিন গাড়িতে জ্বালানি ভরার সময় বেশি অর্থ দিতে হয়, তাহলে তাকে সামষ্টিক অর্থনীতির ইতিবাচক সূচক দেখিয়ে সন্তুষ্ট করা কঠিন।
এ কারণেই হরমুজ সংকট এখন ট্রাম্পের জন্য শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়।
এটি ধীরে ধীরে একটি ঘরোয়া রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, তবে সতর্কবার্তা স্পষ্ট
জিমি কার্টার এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিস্থিতিকে পুরোপুরি এক বলা ঠিক হবে না।
1979-80 সালে 52 মার্কিন নাগরিককে সরাসরি জিম্মি করে রাখা হয়েছিল এবং সংকটটি 444 দিন স্থায়ী হয়েছিল। বর্তমান ঘটনায় সেই ধরনের মানবিক জিম্মি পরিস্থিতি নেই।
কিন্তু রাজনৈতিক মিলটি অন্য জায়গায়।
দুই ক্ষেত্রেই ইরানসংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এবং দুই ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক উদ্বেগ সেই চাপকে আরও তীব্র করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
কার্টারের সময় ব্যর্থ উদ্ধার অভিযান ও দীর্ঘস্থায়ী জিম্মি সংকট নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে—তিনি কি হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করতে পারবেন, জ্বালানির দাম কমাতে পারবেন এবং একই সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতা এড়াতে পারবেন যা রাজনৈতিকভাবে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হবে?
সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়
নভেম্বরের নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি সপ্তাহ এখন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ প্রণালি দ্রুত স্বাভাবিক হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। জ্বালানির দাম কমলে এবং কর্মসংস্থানের পরবর্তী পরিসংখ্যান ভালো হলে ট্রাম্প অর্থনীতি নিয়ে আবার আক্রমণাত্মক অবস্থানে ফিরতে পারেন।
ডেমোক্র্যাটদের অভ্যন্তরীণ আদর্শিক দ্বন্দ্বও তাকে সুযোগ দিতে পারে।
কিন্তু উল্টো পরিস্থিতিও সম্ভব।
ইরানের সঙ্গে অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে, পেট্রোলের দাম উঁচু থাকলে, চাকরির বাজার আরও দুর্বল হলে এবং ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমার লক্ষণ না দেখা গেলে মধ্যবর্তী নির্বাচন রিপাবলিকানদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
ট্রাম্প অ্যাক্সিওসকে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যাবে এবং পুরো বিষয়টি দাবার খেলার মতো।
রাজনীতির সমস্যা হলো, দাবার খেলায় একজন খেলোয়াড় অনেক সময় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে পারেন। নির্বাচনে সেই সুযোগ থাকে না।
ট্রাম্পের হাতে তাই এখন শুধু ইরানকে চাপে ফেলার চ্যালেঞ্জ নয়; একই সঙ্গে সময়ের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি, জ্বালানির দাম, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভোটারদের আস্থা—এই পাঁচটি বিষয় আগামী কয়েক মাসে একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যেতে পারে, যা তার দ্বিতীয় মেয়াদের ভবিষ্যৎ এবং রিপাবলিকান দলের নভেম্বরের নির্বাচনী ভাগ্য—দুটিই নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি তাই শুধু ইরান নতি স্বীকার করবে কি না, সেটি নয়।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—ইরানকে নতি স্বীকার করানোর জন্য ট্রাম্প যত দিন অপেক্ষা করতে চান, যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কি তত দিন অপেক্ষা করতে প্রস্তুত?

