তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরোধ চুক্তি’কে ঘিরে আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি আরও বিস্তৃত করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তুরস্ক। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—ভবিষ্যতে কোন কোন দেশ এই জোটে যুক্ত হতে পারে?
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই জোটকে কেবল তিন দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য দেশগুলোকেও এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। অর্থাৎ তিন দেশের যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে সেটিকে অন্য দুই দেশের ওপরও আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এ কারণে চুক্তিটিকে ঘিরে ন্যাটোর মতো একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
তবে নতুন সদস্য যুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু সামরিক সক্ষমতা নয়, প্রতিটি দেশের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থান, পুরোনো চুক্তি এবং আঞ্চলিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সম্ভাব্য নতুন সদস্যদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে মিশরের নাম। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিশরকে এই জোটের ‘প্রাকৃতিক অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ছোটখাটো কিছু কারিগরি বিষয় সমাধান করা গেলে মিশর জোটে যোগ দিতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আঙ্কারা ও কায়রোর সম্পর্ক আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। ফলে মিশরের সঙ্গে তুরস্কের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে মিশরের জন্য বিষয়টি খুব সহজ হবে না। দেশটির যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা চুক্তি। নতুন কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার কারণে এসব সম্পর্ক যাতে জটিল হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে কায়রোকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষ করে কোনো সামরিক সংঘাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি মিশর নিতে চাইবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। ইসরাইল ও লিবিয়া ইস্যুতে তুরস্কের সঙ্গে মিশরের কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে কায়রো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জোটের আইনি কাঠামো এবং নিরাপত্তাগত দায়বদ্ধতাগুলো ভালোভাবে পর্যালোচনা করবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মিশরের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশকেও সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে কাতার ও কুয়েতের নাম আলোচনায় রয়েছে।
কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হামাদ বিন জাসিম আল থানি আশা প্রকাশ করেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সব দেশই যেন এই প্রতিরক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়।
তুরস্কের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, বেশ কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে এই জোটে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এখনো সেসব দেশের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের অভিজ্ঞতার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ভাবনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে। নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করতে এসব দেশ নতুন কোনো কাঠামোর দিকে ঝুঁকতে পারে।
এই বিবেচনায় কাতার ও কুয়েতকে সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও কয়েকটি দেশের নাম সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে সামনে এসেছে। এর মধ্যে আজারবাইজান, সিরিয়া ও জর্ডানের নাম বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
তুরস্কের সঙ্গে আজারবাইজানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আঙ্কারা যদি জোটের পরিধি বাড়াতে চায়, বাকুর দিকে তাদের নজর থাকা স্বাভাবিক।
অন্যদিকে সিরিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জর্ডানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের হিসাব রয়েছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। তাই কোনো নতুন সামরিক কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার আগে জোটের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য দায়বদ্ধতা বিবেচনা করবে আম্মান।
তিন দেশের বর্তমান উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এটি কি ভবিষ্যতে একটি বড় আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে পরিণত হবে?
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাতারাতি বিশাল সামরিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নতুন সদস্য যুক্ত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে তুরস্কের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থকে একই কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় করা। কারণ সম্ভাব্য সদস্যদের প্রত্যেকেরই আলাদা কূটনৈতিক সম্পর্ক, সামরিক অঙ্গীকার এবং আঞ্চলিক অগ্রাধিকার রয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের জন্যও জোটের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সদস্য বাড়লে সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমন্বয়ের ক্ষেত্রও বিস্তৃত হবে।
তবে জোট যত বড় হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত জটিল হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কোনো একটি দেশের আঞ্চলিক বিরোধ যদি পুরো জোটকে প্রভাবিত করে, তাহলে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে—সেটিও ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মিশর, কাতার, কুয়েত, আজারবাইজান, সিরিয়া ও জর্ডানের মতো দেশগুলো শেষ পর্যন্ত এতে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে সম্ভাব্য সম্প্রসারণের আলোচনা থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তিন দেশের চুক্তিটিকে আরও বড় আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ দেওয়ার একটি আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে।

