কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৩২ ছাড়িয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৫৭০ জন। শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে বহু ভবন ধসে পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেকে আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধারকাজ চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে স্থানীয় বাসিন্দারাও সহযোগিতা করছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, সোমবার (১০ আগস্ট) ভোরে কলম্বিয়ায় ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এর উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমারের কাছে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল ১০৭ কিলোমিটার।
ভূমিকম্পের কম্পন শুধু উৎপত্তিস্থলের আশপাশে সীমাবদ্ধ ছিল না। কলম্বিয়ার বিভিন্ন বড় শহরেও শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে পশ্চিমাঞ্চলীয় রিসারালদা প্রদেশে। কফি উৎপাদনের জন্য পরিচিত এই অঞ্চলের গভর্নর হুয়ান দিয়েগো পাতিনো টেলিভিশন চ্যানেল কারাকোলকে জানিয়েছেন, প্রদেশটিতে অন্তত ৪২ জন নিহত হয়েছেন।
ভূমিকম্পে দেশটির অন্যতম বড় শহর ক্যালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শহরের মেয়র আলেহান্দ্রো এদের জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত ৩০টি ভবন ধসে পড়েছে। এর মধ্যে ১০টি ভবনে উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে ক্যালিতে এখনো কতজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত কোনো সংখ্যা জানায়নি।
ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা হুয়ান কার্লোস অসোরিও জানান, ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং ঘটনাটি তার কাছে বোমা বিস্ফোরণের মতো মনে হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা করছেন। তবে উদ্ধারকাজ আরও দ্রুত করতে ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন বলে তিনি জানান।
রিসারালদা প্রদেশের রাজধানী পেরেইরাতেও ভূমিকম্পের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে একটি ভবনের ফাটল ধরা সামনের অংশ ধসে পড়তে দেখা গেছে। মুহূর্তের মধ্যে ধুলা ও ধ্বংসাবশেষে চারপাশ ঢেকে যায়। আতঙ্কিত মানুষ তখন রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে আসেন।
ম্যানিজালেস শহরেও ভূমিকম্পের প্রভাব পড়েছে। শহরের একটি নব্য-গথিক গির্জার ওপরের টাওয়ারগুলোর একটি ভূমিকম্পের আঘাতে ধসে পড়ে।
উৎপত্তিস্থলের সবচেয়ে কাছের প্রদেশ চোকোতেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। প্রদেশটির গভর্নর নুবিয়া ক্যারোলিনা কর্দোবা-কুরি জানিয়েছেন, রাজধানী কুইবদোতে প্রাণহানি, আহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
ভূমিকম্পের পর আরও কম্পন বা পরাঘাতের আশঙ্কা থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ভূমিকম্পের পর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করা। অনেক এলাকায় ভবন ধসে পড়ায় স্বাভাবিক যোগাযোগ ও উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে উদ্ধারকাজে এগিয়ে এসেছেন।
নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সব এলাকায় এখনো উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শেষ হয়নি।
এই দুর্যোগ এমন এক সময়ে কলম্বিয়াকে আঘাত করল, যখন দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লা দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পরই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছেন। ফলে নতুন প্রশাসনের সামনে এখন একদিকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের বড় দায়িত্ব এসে দাঁড়িয়েছে।
এর আগে গত জুনে প্রতিবেশী ভেনেজুয়েলাতেও দুটি ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ আমেরিকার এই অঞ্চলে একের পর এক শক্তিশালী ভূমিকম্প নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

