একসময় জুম কলে এক ধাক্কায় নয়শ কর্মীকে ছাঁটাই করে আলোচনায় আসা প্রযুক্তিভিত্তিক মর্টগেজ প্রতিষ্ঠান বেটার হোম অ্যান্ড ফাইন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা বিশাল গর্গ নিজেই এবার শীর্ষ পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এই ঘটনায় তিনি নিজেকে প্রতারণার শিকার বলে দাবি করছেন এবং যিনি তাকে সরিয়ে দিয়েছেন, সেই নতুন প্রধান নির্বাহী ড্যানিয়েল লুইসের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন।
বিশালের ভাষ্যমতে, লুইস প্রথমে কোম্পানির ব্যবসায়িক কৌশলের প্রশংসা করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলাখুলি সমর্থন জানিয়ে তাদের আস্থা অর্জন করেছিলেন। সেই আস্থাকেই কাজে লাগিয়ে তিনি বোর্ডে জায়গা করে নেন বলে বিশালের অভিযোগ।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ছুটির মৌসুমের ঠিক আগমুহূর্তে একটি জুম কলে একসঙ্গে নয়শ কর্মীকে ছাঁটাই করে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন বিশাল। সাম্প্রতিক সময়ে, যখন কোম্পানিকে বড় ধরনের সাফল্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিলেন বলে তার দাবি, ঠিক তখনই আকস্মিকভাবে তাকে বরখাস্ত করা হয়।
বিশালের নেতৃত্বে গত কয়েক বছরে কোম্পানিটি বহু উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। মহামারিকালে মর্টগেজ সুদের হার তলানিতে নেমে গেলে রিফাইন্যান্সিং খাতে ব্যাপক জোয়ার আসে, তখন কোম্পানির বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে বর্তমানে সুদের হার আবার উচ্চ পর্যায়ে ফিরে যাওয়ায় রিফাইন্যান্সিং ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়ে, আর কোম্পানির বাজারমূল্যও অনেকাংশে কমে যায়।
এর পাশাপাশি জুম-ছাঁটাইকাণ্ডের জেরে কোম্পানিকে সইতে হয়েছে বাধ্যতামূলক ছুটি, একাধিক আইনি জটিলতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদন্ত, একটি বড় একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা এবং টানা কয়েক বছরের আর্থিক লোকসান।
বিশালের দাবি, এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি কোম্পানিকে ঘুরে দাঁড় করানোর একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। মূল ব্যবসা ধসে পড়ার পর কোম্পানির বার্ষিক আয় বিপুল পরিমাণে কমে গেলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঋণ প্রক্রিয়াকরণের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে তিনি জানান। এই সাফল্যে আকৃষ্ট হয়ে বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান চলতি বছর কোম্পানিটির সঙ্গে অংশীদারত্ব স্থাপন করে।
বিশাল বলেন, তারা তখন ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়িয়েছিলেন এবং লাভের মুখ দেখার একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন।
বিশাল স্বীকার করেন যে তার নেতৃত্বশৈলী বেশ কঠোর ছিল, আর সেই বিখ্যাত ছাঁটাই-ঘটনা কোম্পানির সুনামে গভীর দাগ ফেলেছিল। এ জন্য তাকে দীর্ঘদিন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। তবে নতুন সিইও লুইস বোর্ডকে বুঝিয়েছিলেন যে বিশাল আসলে যথেষ্ট কঠোর ছিলেন না।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য কোম্পানি ও লুইসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে লুইস লিখেছিলেন, বিশাল ছাড়া কোম্পানির অস্তিত্বই থাকত না এবং তার অবদান সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
পেশায় একজন হেজ ফান্ড ব্যবস্থাপক লুইস কয়েক মাস আগে খরচ কমানো ও মুনাফা বাড়ানোর কিছু পরিকল্পনা নিয়ে বিশালের কাছে এসেছিলেন। বিশালের ভাষ্যে, খরচ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে লুইসের কিছু ধারণা ভালো থাকলেও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনায় তিনি ততটা কার্যকর ছিলেন না।
জুলাইয়ের শেষ দিকে লুইসকে বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, আর এর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বোর্ডের অন্য পরিচালকদের রাজি করিয়ে বিশালকে সিইও পদ থেকে সরিয়ে নিজে সেই পদে বসেন।
বিশাল বলেন, বিষয়টি শুধু তার ব্যক্তিগত স্বার্থের নয়—তিনি মানুষের অর্থ সাশ্রয় ও স্বপ্নপূরণে সহায়তা করতে চান। তাই শেয়ারহোল্ডারদের সিদ্ধান্ত তিনি প্রথমে মেনে নিয়েছিলেন। তবে তার বিশ্বাস, লুইস শুরু থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে সিইও পদ দখলের লক্ষ্যেই এগিয়েছিলেন, আর বোর্ড এ ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
লুইস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কোম্পানির শেয়ারদর উল্লেখযোগ্য হারে পড়ে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এরই মধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী বিশালের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে আবার সিইও পদে ফিরে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন। বিশেষ ভোটিং ক্ষমতাসম্পন্ন শেয়ারের কারণে তার হাতে যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
আইনি লড়াইয়ের জন্য ইতিমধ্যে একজন খ্যাতনামা আইনজীবী নিয়োগ করেছেন বিশাল এবং সিইও পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বোর্ডের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠিও পাঠিয়েছেন। তিনি জানান, কোম্পানি আবার লাভজনক অবস্থায় না ফেরা পর্যন্ত তিনি প্রতীকী বেতনে কাজ করতে রাজি আছেন, তারপর স্বেচ্ছায় পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন।
সবশেষে তিনি বলেন, গত এক দশকে তার নেতৃত্ব সবসময় নিখুঁত ছিল না—এ কথা তিনি স্বীকার করেন, তবে কোম্পানির ভবিষ্যৎ এখনো উজ্জ্বল বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।

