যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতায় নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ‘ভালো সম্পর্ক’ এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা না করার বিষয়টি সামনে এনে দেশটির সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
রোববার ১৬ আগস্ট হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ কমানো উচিত। তাঁর যুক্তি, এসব মহড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল এবং উত্তর কোরিয়ার প্রতি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বৈরী বার্তা পাঠায়।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ সামরিক মহড়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। সোমবার থেকে শুরু হয়ে ১০ দিন চলার কথা ছিল এই মহড়ার। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ জানিয়েছে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী মহড়া শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের ঘোষণার পর এর পরিধি বা কার্যক্রম কতটা কমানো হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক সাত দশকেরও বেশি সময়ের। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যার প্রধান উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য সামরিক হুমকি মোকাবিলা করা। উত্তর কোরিয়া বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র ও আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের অধিকারী হওয়ায় এই সামরিক জোটের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া বড় আকারের যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। এসব মহড়ায় হাজার হাজার সেনা এবং বিপুল সামরিক সরঞ্জাম অংশ নেয়। এবারের মহড়ায় অন্তত ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
শুধু প্রচলিত যুদ্ধের প্রস্তুতিই নয়, উত্তর কোরিয়ার বদলে যাওয়া সামরিক সক্ষমতার কথা মাথায় রেখে এবারের মহড়ায় চালকবিহীন আকাশযান, বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয় ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং সাইবার হামলা মোকাবিলার প্রশিক্ষণও রাখার পরিকল্পনা ছিল।
উত্তর কোরিয়া বরাবরই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। গত সপ্তাহেও দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আসন্ন মহড়াকে ‘আগ্রাসী যুদ্ধের মহড়া’ হিসেবে উল্লেখ করে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি বলে অভিহিত করেছিল।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গুরুত্বকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ট্রাম্প তাঁর বার্তায় স্পষ্ট করে বলেছেন, কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়ে যাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট নন। তাঁর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সম্পর্কের পরিবেশ তৈরি করতে সামরিক চাপ কিছুটা কমানোর বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন।
এ ধরনের অবস্থান অবশ্য ট্রাম্পের জন্য নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদেও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বড় সামরিক মহড়ার পরিধি কমানো হয়েছিল।
২০১৮ সালে কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনা চলার মধ্যে কোরীয় উপদ্বীপে বড় ধরনের যুদ্ধের মহড়া চালানো উপযুক্ত নয়। পরে ২০১৯ সালে দুই দেশ বড় আকারের বার্ষিক সামরিক মহড়ার পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট পরিসরের মহড়ায় যাওয়ার ঘোষণা দেয়।
তখনও ট্রাম্প মহড়ার ব্যয়ের বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যার পুরোটা যুক্তরাষ্ট্র ফেরত পায় না।
এবারও সেই অর্থনৈতিক যুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—ইরান।
ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে অভিযোগ করেছেন, সম্প্রতি তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করার মার্কিন অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করেছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়া সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি বলে ট্রাম্প উল্লেখ করেন।
তবে দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। সামরিক ও অন্যান্য বাস্তব সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে সিউল।
ফলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে শুধু উত্তর কোরিয়া ইস্যু দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের burden-sharing বা সামরিক ও আর্থিক দায় ভাগাভাগি নিয়েও ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের অবস্থান কাজ করছে।
ট্রাম্প বরাবরই অভিযোগ করে আসছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করে, অথচ মিত্ররা প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে যথেষ্ট সহায়তা করে না। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে ইরান ইস্যুতে সহযোগিতা না করার বিষয়টি সেই অসন্তোষকে আরও বাড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এটি উত্তর কোরিয়ার নিরাপত্তা হিসাবেও কী প্রভাব ফেলবে।
উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক মহড়াকে নিজেদের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি হিসেবে দেখে। ফলে মহড়ার পরিধি কমানো হলে পিয়ংইয়ং এটিকে নিজেদের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখাতে পারে।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য বিষয়টি এতটা সরল নয়। দেশটির নিরাপত্তা কাঠামোর একটি বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও যৌথ প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীল। মহড়া কমে গেলে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে দুই দেশের সেনাদের সমন্বিত প্রস্তুতি কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া যখন পারমাণবিক অস্ত্র ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, তখন সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তকে সিউলে কেউ কেউ নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবেও দেখতে পারেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, ট্রাম্পের বক্তব্য তারা পর্যালোচনা করছে। একই সঙ্গে মহড়াসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে এবং দুই দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্ত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেবে।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। দুই দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো যুদ্ধে রয়েছে। ১৯৫৩ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি বলেছেন।
এদিকে কিম জং উন এখনো ট্রাম্পের সামরিক মহড়া কমানোর ঘোষণার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে উত্তর কোরিয়ার সেনা ও ক্ষেপণাস্ত্র সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
অর্থাৎ একদিকে ট্রাম্প কিমের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কূটনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে কিমের নেতৃত্বাধীন উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদার করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই বলা কঠিন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সামরিক মহড়া কমিয়ে ট্রাম্প কি কিমকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে পারবেন?
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো স্থায়ী সমঝোতা হয়নি। ২০১৯ সালে হ্যানয়ে দুই নেতার বৈঠকও কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়।
তারপরও ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প বারবার কিমের সঙ্গে নিজের ভালো সম্পর্কের কথা বলেছেন। সম্প্রতি তিনি তাঁদের একসঙ্গে তোলা একটি ছবিও প্রকাশ করে বলেছেন, ছবিতে দুজনকে গম্ভীর দেখালেও তাঁদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে।
এখন সামরিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্ত সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে নতুন কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগের পথ তৈরি করে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
তবে এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়া জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য সামরিক মহড়া কমানো হলে সিউল কতটা নিরাপদ বোধ করবে, আর ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক কতটা অটুট থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগামী দিনগুলোতে আরও পরিষ্কার হবে।
ট্রাম্পের ঘোষণায় তাই শুধু একটি সামরিক মহড়া কমানোর বিষয় নেই। এর মধ্যে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা, মিত্রদের কাছ থেকে আরও সহযোগিতা আদায়ের চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় কমানোর পুরোনো অবস্থান—তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে কাজ করছে।
শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন একটাই—কিমের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমাচ্ছেন, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এশীয় প্রতিরক্ষা কৌশলেই বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন?

