বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান বিরোধ এবার নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তিনি খুব শিগগির হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে চান। কথাটি রাজনৈতিকভাবে যতটা চমকপ্রদ, বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক আইনের বিচারে তা কার্যকর করা ততটাই জটিল।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ নিয়ে এমন দাবি তাদের কাছে অর্থহীন। একই সময়ে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মেয়াদও শেষ হওয়ার পথে পৌঁছেছে। ফলে হরমুজকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক দরকষাকষি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা—তিনটি বিষয়ই এখন একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে বদলে যায় পরিস্থিতি
চলমান সংকটের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ২৮ ফেব্রুয়ারি। সেদিন ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলার পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেয়।
হরমুজ কোনো সাধারণ জলপথ নয়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়া মানে শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হওয়া নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও।
মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং নৌ চলাচলের ভবিষ্যৎ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ এখন শুধু একটি জলপথ নয়; এটি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক দরকষাকষির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
হরমুজকে চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ইরান হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে। তেহরানের হিসাব তুলনামূলকভাবে সরল—বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। ফলে ইরানের অর্থনীতিও চাপে রয়েছে।
অর্থাৎ দুই পক্ষই এমন অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কেউ প্রথমে ছাড় দিতে চাইছে না। একদিকে ইরান হরমুজকে কেন্দ্র করে চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তেহরানকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে তাই প্রশ্নটি শুধু কে হরমুজ নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটি নয়। আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কে আগে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য নিজের অবস্থান নরম করবে।
ট্রাম্প নিজেই ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনাকে দাবা খেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
ট্রাম্প আসলে কী বলেছেন?
নিউইয়র্কের একটি পুলিশ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, খুব শিগগির ইরানের পরাজয় ঘটবে এবং সেই পরাজয় হবে অত্যন্ত করুণ। এরপর ইরানকে পরাজিত করার কাজ শেষ হলে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি।
এখানেই থামেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে বাস্তবে হরমুজ ইতোমধ্যেই মার্কিন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র অনুমতি না দিলে ওই পথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ট্রাম্পের বক্তব্যের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। সামুদ্রিক নৌ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধ থাকা সত্ত্বেও কিছু জাহাজ এখনো এই প্রণালি ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, হরমুজের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই রয়েছে।
ফলে এখানে সামরিক নিয়ন্ত্রণের দাবি এবং বাস্তব নৌ চলাচলের পরিস্থিতির মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
বক্তব্যটি কি রাজনৈতিক কৌশল?
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক কিম্বার্লি হ্যালকেট ট্রাম্পের বক্তব্যের ধরন পর্যবেক্ষণ করে বলেছেন, হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড করার কথা বলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই হেসেছিলেন। তার মতে, ট্রাম্প নিজেও সম্ভবত বক্তব্যটিকে পুরোপুরি আক্ষরিক অর্থে উপস্থাপন করেননি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে তার বক্তব্য গুরুত্বহীন।
কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বাস্তব এবং ওয়াশিংটন সেই অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত এখনো দেয়নি।
এখানেই ট্রাম্পের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব।
হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা আইনগতভাবে অবাস্তব হতে পারে, কিন্তু এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একদিকে ইরানকে বার্তা দিচ্ছেন, অন্যদিকে নিজ দেশের সমর্থকদের সামনে শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে চাইছেন।
ইরানের পাল্টা বক্তব্য আরও কঠোর
ট্রাম্পের ঘোষণায় ইরানের কর্মকর্তারা অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই ট্রাম্পকে অপরাধী ও বুদ্ধিহীন বলে আক্রমণ করেন। তার বক্তব্য, হরমুজ ইরানেরই থাকবে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদিও আরও স্পষ্ট ভাষায় ওয়াশিংটনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তার বক্তব্যের মূল কথা হলো—কোনো বার্তা, বিমানবাহী রণতরী, সরকারি আদেশ কিংবা রাজনৈতিক বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ দখল করা সম্ভব নয়।
তিনি দাবি করেন, হরমুজ ইরানের ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এমনকি প্রণালিটি কখন খোলা বা বন্ধ হবে, সেটিও ইরানের সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হবে বলে দাবি করেন তিনি।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তেহরান শুধু ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করছে না; হরমুজ নিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান আরও দৃঢ়ভাবে তুলে ধরছে।
ওমানের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালির প্রশ্নে ওমানকে বাদ দিয়ে পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।
প্রণালিটির এক পাশে ইরান, অন্য পাশে ওমান। ফলে এর নৌ চলাচল ও আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনায় মাসকাটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান ইতোমধ্যে ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে নৌ চলাচল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরান ও মাসকাটের আলোচনার মাধ্যমে শিগগিরই কোনো সমাধান বের হতে পারে।
তবে নৌ চলাচলের ব্যবস্থাপনা এবং হরমুজকে সবার জন্য পুরোপুরি খুলে দেওয়া—এই দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখছে তেহরান।
ইরানের দাবি, প্রণালিটি সম্পূর্ণভাবে খুলে দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে গত জুনের সমঝোতা স্মারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
এখানেই ইরানের কৌশলে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
আগে যেসব বিষয় যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল, এখন হরমুজ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়েও সেই সুবিধাগুলো দাবি করছে তেহরান।
ট্রাম্পের দাবি বাস্তবে কতটা সম্ভব?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই।
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি শুধু ঘোষণা দিয়েই হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বানিয়ে ফেলতে পারেন?
আন্তর্জাতিক আইন ও মার্কিন সাংবিধানিক কাঠামোর বিচারে উত্তরটি কার্যত না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান একতরফাভাবে ঘোষণা দিলেই অন্য ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্ব বদলে যায় না।
এর আগে ট্রাম্প উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের জন্য সেনা পাঠানোর হুমকিও দিয়েছিলেন। ইরান তখন জানিয়েছিল, তাদের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ মোকাবিলায় প্রস্তুত।
হরমুজ নিয়ে বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে ট্রাম্পের আগের আরও কিছু ভূখণ্ডকেন্দ্রিক ঘোষণার মিল পাওয়া যায়। তিনি এর আগে ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড নিয়েও দখলের হুমকি দিয়েছিলেন।
ফলে অনেক বিশ্লেষক ট্রাম্পের এ ধরনের বক্তব্যকে সরাসরি কোনো বাস্তব ভূখণ্ড অধিগ্রহণ পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
মার্কিন সংবিধানও বড় বাধা
প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময় সহযোগী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্রুস ফেইনের মতে, মার্কিন সংবিধানেও প্রেসিডেন্টকে এককভাবে কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি।
কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে সাধারণত সিনেটের অনুমোদন পাওয়া চুক্তি অথবা আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন।
ইতিহাসে লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াইকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করা, পানামা খালসংক্রান্ত ব্যবস্থা কিংবা স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের শেষে পুয়ের্তোরিকো ও ফিলিপাইন অধিগ্রহণ—এসব ক্ষেত্রেও আনুষ্ঠানিক আইনি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।
অতএব ট্রাম্প চাইলেই একটি বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে পারবেন—এমন ধারণার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
বরং সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলে তা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে গুরুতর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সামরিক দখল ছাড়া কোনো পথ আছে?
সিডনির ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ন্যাটালি ক্লেইনের বিশ্লেষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
তার মতে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের দাবির সামান্যতম বাস্তব ভিত্তি তৈরি করতে হলেও যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত দখলদার শক্তি হিসেবে হরমুজ অঞ্চলে সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অর্থাৎ শুধু সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন বা নৌ অবরোধই যথেষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর অথবা অন্তত ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর সুস্পষ্ট ও কার্যকর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানে যুক্তরাষ্ট্র যে ধরনের দখলদার প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই ধরনের পরিস্থিতি ছাড়া হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড দাবি করার আইনি ভিত্তি দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব।
আর এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে গেলে তার অর্থ হবে সংঘাতকে বর্তমান পর্যায়ের তুলনায় বহুগুণ বিস্তৃত করা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধ নিয়ে অস্বস্তি
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আরও বড় সমস্যা হলো, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ মার্কিন জনগণের মধ্যে খুব বেশি জনপ্রিয় নয়।
রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধকে সমর্থন করেন।
অন্যদিকে ৬১ শতাংশ মার্কিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সামনে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন। অনেক বিশ্লেষকের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার জন্য নির্বাচনটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হরমুজ নিয়ে কঠোর বক্তব্য দিলেও ট্রাম্পকে একই সঙ্গে দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
অস্ত্রের মজুত নিয়েও চাপ
যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কমাচ্ছে না, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জামের ওপরও চাপ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে।
বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সেনা ও সামরিক স্থাপনাকে ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমেছে।
এই ব্যবস্থা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত যুদ্ধবিমান প্রতিহত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফলে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামরিক সরবরাহের দিক থেকেও নতুন চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে।
যুদ্ধের চাপ এখন মার্কিন নাগরিকের পকেটেও
ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ সংকটের আরেকটি সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে।
দেশটিতে পেট্রলের দাম বেড়ে প্রতি গ্যালনে গড়ে ৪ ডলারের বেশি হয়েছে।
একজন সাধারণ মার্কিন ভোটারের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি অনেক দূরের বিষয় মনে হতে পারে। কিন্তু যখন সেই সংঘাতের প্রভাব সরাসরি গাড়ির জ্বালানি খরচে গিয়ে পড়ে, তখন তা দ্রুত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
গত সপ্তাহে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও বলেছেন, যুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান প্রথম অগ্রাধিকার তেলের দাম কমানো।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখা।
এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে বোঝা যায়, যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণে এখন নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপও বড় ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোকে কেন লক্ষ্য করছে ইরান?
তেহরান শুধু হরমুজ বন্ধ করেই চাপ সৃষ্টি করছে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি প্রতিবেশী দেশেও হামলা চালিয়েছে ইরান।
বিশেষ করে যেসব দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামো অথবা সেনা রয়েছে, সেসব স্থান বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলাগুলোর লক্ষ্য সরাসরি ওই দেশগুলোর সঙ্গে নতুন যুদ্ধ শুরু করা নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল্য শুধু ওয়াশিংটনকেই নয়, তার আঞ্চলিক মিত্রদেরও দিতে হতে পারে।
হরমুজ বন্ধ রাখা এবং মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থাকা প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি—দুটিই একই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে।
লক্ষ্য হচ্ছে আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ানো।
পুরো হরমুজের মালিক কি ইরান?
হরমুজ নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকটি প্রায়ই রাজনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে পড়ে যায়।
বাস্তবতা হলো, পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক সার্বভৌম অধিকার নেই।
সমুদ্র আইনবিষয়ক জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী, উপকূলীয় রাষ্ট্র তার উপকূল থেকে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ২২ কিলোমিটার পর্যন্ত আঞ্চলিক জলসীমার ওপর সার্বভৌম অধিকার দাবি করতে পারে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সেই জলসীমা দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া যাবে।
আন্তর্জাতিক প্রণালির ক্ষেত্রে বিদেশি জাহাজের চলাচলের অধিকার স্বীকৃত।
হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল বা প্রায় ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত।
এ কারণে ইরান ও ওমান—দুই দেশের ১২ নটিক্যাল মাইল আঞ্চলিক জলসীমার দাবি ওই সরু অংশে একে অপরের কাছাকাছি চলে আসে।
অর্থাৎ ভৌগোলিকভাবেই হরমুজ এমন একটি জলপথ, যাকে কোনো একটি দেশের সাধারণ অভ্যন্তরীণ জলসীমার মতো বিবেচনা করা কঠিন।
আর এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের বড় বড় রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবতার সংঘাত তৈরি হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—কেউই পুরোপুরি মালিক নয়
হরমুজ সংকট বুঝতে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন।
ইরান পুরো প্রণালিটির একক মালিক নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও সামরিক উপস্থিতি বা অবরোধের মাধ্যমে প্রণালিটির সার্বভৌম মালিক হয়ে যেতে পারে না।
হরমুজ মূলত এমন এক আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথ, যার দুই পাশে ইরান ও ওমানের ভূখণ্ড রয়েছে এবং যার মধ্য দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের বিশাল অংশ পরিচালিত হয়।
তাই এটিকে একতরফাভাবে কোনো একটি দেশের জাতীয় ভূখণ্ডে পরিণত করার দাবি বাস্তবে আন্তর্জাতিক বিরোধ আরও বাড়াতে পারে।
তাহলে ট্রাম্প এমন কথা বলছেন কেন?
কাতারে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের বিশ্লেষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, ট্রাম্প প্রায়ই এমন বক্তব্য দেন, যার প্রধান শ্রোতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভোটার, বিশেষ করে তার রাজনৈতিক সমর্থকেরা।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক যোগাযোগের ধরনে নাটকীয়তা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ।
বড় ঘোষণা, প্রতিপক্ষকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ, সহজ ভাষায় বিজয়ের প্রতিশ্রুতি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়কের ভাবমূর্তি—এসব তার রাজনৈতিক কৌশলের পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
ফলে হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করে নেওয়ার কথা আক্ষরিক অর্থে বাস্তব পরিকল্পনা না হলেও এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
এর মাধ্যমে তিনি কয়েকটি বার্তা দিতে পারেন।
প্রথমত, ইরানের বিরুদ্ধে তিনি পিছু হটছেন না।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিকভাবে শক্তিশালী।
তৃতীয়ত, আলোচনার টেবিলে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের আছে—এমন ধারণা তৈরি করা।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?
ট্রাম্পের বক্তব্য আইনগতভাবে বাস্তবসম্মত না হলেও এটিকে পুরোপুরি গুরুত্বহীন ভাবার সুযোগ নেই।
কারণ রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য অনেক সময় সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে বাস্তব প্রভাব তৈরি করতে পারে।
হরমুজ এমন একটি অঞ্চল, যেখানে ভুল হিসাবের মূল্য অত্যন্ত বেশি।
একটি জাহাজ আটকে দেওয়া, একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা কোনো সামরিক তৎপরতা কিংবা প্রতিশোধমূলক অভিযান খুব দ্রুত বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
আর হরমুজে বড় ধরনের সংঘাত হলে তার প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমিত থাকবে না।
বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়তে পারে, জাহাজ পরিবহনের খরচ বেড়ে যেতে পারে, বিমা ব্যয় বাড়তে পারে এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কার হাতে সুবিধা?
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দেখাতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তার নৌ শক্তির কারণে হরমুজে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ইরান বলছে, প্রণালিটি কখন খুলবে বা বন্ধ হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের হাতে।
কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত এই দুই দাবির মাঝামাঝি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষমতা অবশ্যই বিশাল এবং হরমুজ অঞ্চলে তার উপস্থিতি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আবার ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানও তাকে এমন একটি সুবিধা দিয়েছে, যার কারণে হরমুজে সংকট তৈরি করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।
ফলে এটি কেবল সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা নয়।
এটি ভৌগোলিক সুবিধা, জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক আইন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং কূটনৈতিক দরকষাকষির সম্মিলিত লড়াই।
হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বানানোর ট্রাম্পের ঘোষণা রাজনৈতিকভাবে চাঞ্চল্যকর হলেও আইনগত ও বাস্তব দিক থেকে তা প্রায় অসম্ভব।
একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট একক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো জলপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করতে পারেন না। এমন উদ্যোগ নিতে গেলে মার্কিন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব এবং সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত—সবকিছুর মুখোমুখি হতে হবে।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে শুধু কৌতুক বা কথার কথা হিসেবেও উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কঠোর অবস্থান ধরে রাখতে চায়। একই সঙ্গে তেহরানও হরমুজকে তার সবচেয়ে কার্যকর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
শেষ পর্যন্ত হরমুজ নিয়ে মূল প্রশ্ন হয়তো কে এর মালিক হবে, সেটি নয়।
বরং বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই শক্তির লড়াই কত দূর যাবে, কে আগে সমঝোতায় আসবে এবং তার আগে বিশ্ব অর্থনীতিকে কতটা মূল্য দিতে হবে।

