ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উত্তেজনা নতুন করে আরও জটিল হয়ে উঠছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ এখনো খোলেনি। বরং ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রভাব শুধু তেহরানের অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের নতুন করে সংঘাত তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চীনকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ধীরে ধীরে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইরান সমুদ্রপথে যে তেল রপ্তানি করে, তার ৮০ শতাংশের বেশি কিনে থাকে চীন। অর্থাৎ ইরানের তেল রপ্তানি ব্যবস্থা সচল রাখার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন ওয়াশিংটন যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়ায়, তাহলে চীনও সেই চাপের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার নতুন ধাক্কা, লক্ষ্য চীনের দিকেও
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে। সেখানে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আসতে পারে।
এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো—যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে না, বরং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া অন্য দেশগুলোকেও সতর্ক করছে।
বিশেষ করে চীনের বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের বিপুল পরিমাণ তেল চীনে যায়। ফলে ইরানের তেল রপ্তানি কমিয়ে দিতে হলে চীনা ক্রেতাদের ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। আর সেখান থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক বিরোধের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বেইজিং অবশ্য এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো পক্ষ নেওয়ার বদলে দুই দেশকেই কূটনৈতিক সমাধানের পথে ফেরার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এমন পদক্ষেপ জাতিসংঘের স্বাধীন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। তিনি আরও বলেছেন, তথাকথিত ‘গৌণ নিষেধাজ্ঞার’ আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, ইরানকে সহায়তা করলে সংশ্লিষ্ট দেশকে অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর জন্যও ঝুঁকি বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথটি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
শত শত জাহাজ এবং হাজার হাজার নাবিক সেখানে আটকা পড়েছেন। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার মাত্র চারটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এসবের কোনোটিই বড় তেলবাহী জাহাজ ছিল না। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী কোনো জাহাজও ওই পথ দিয়ে যায়নি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝা যায় যুদ্ধ শুরুর আগের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল পরিবহন হতো। অর্থাৎ বিশ্বের প্রতিদিনের তেল ব্যবহারের প্রতি পাঁচ ব্যারেলের একটি এই সরু জলপথ দিয়ে যেত।
এখন সেই প্রবাহ প্রায় থেমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। দীর্ঘ সময় এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে তেলের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন দেশের আমদানি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, গত সাত দিনে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনে মার্কিন সামরিক বাহিনী সহায়তা করেছে।তবে এই সহায়তা পরিস্থিতিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে পারেনি।
ইরানের হাতে এখনো পাল্টা আঘাতের সুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু তেহরানের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যায়নি।
ইরানের হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযানের সক্ষমতা রয়েছে। এসব ব্যবহার করে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালানো সম্ভব।
এ কারণেই হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনার বিষয় নয়। এটি এখন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর সময় ইরানকে ঘিরে কয়েকটি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি করা।
কিন্তু এসব লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৫ সাল থেকে জাতিসংঘের পরমাণু পরিদর্শকদের ইরানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে পরিষ্কার তথ্য নেই।
ছয় মাসের যুদ্ধে ভয়াবহ মানবিক ক্ষতি
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন।শুধু যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ১৬৮ জন স্কুলশিক্ষার্থী নিহত হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ৭৫০ জনের বেশি সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন এবং ১৮ জন নিহত হয়েছেন।
এই হতাহতের পাশাপাশি যুদ্ধের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে অর্থনীতি, অবকাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে এসব ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
সামরিক হুমকির পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সামনে
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি শুক্রবার কঠোর সামরিক জবাবের হুমকি দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শত্রুপক্ষের যেকোনো হুমকির জবাব দেওয়া হবে এবং সেই জবাব হবে ‘কঠোর, শাস্তিমূলক ও ধ্বংসাত্মক’।
তবে সামরিক নেতৃত্বের এমন কঠোর বক্তব্যের পাশাপাশি ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ এখন যুদ্ধের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও কথা বলছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তার বক্তব্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে মর্যাদা বজায় রেখেই যুদ্ধ শেষ করার সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রতি সমর্থন তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের কারণে ওয়াশিংটনের প্রতি বিরূপ মনোভাবও বেড়েছে।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ আরও সরাসরি অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বলেছেন।
ইরান ও ইরাকের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৃহস্পতিবারের এক বৈঠকে তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি দেশের সামরিক শক্তি যত বড়ই হোক, জনগণ না খেয়ে থাকলে সেই দেশ টিকে থাকতে পারে না।
এই বক্তব্যটি ইরানের বর্তমান সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। যুদ্ধ চালানোর জন্য শুধু অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। অর্থের প্রবাহ, উৎপাদন ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের জন্যও কঠিন সমীকরণ
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে চীন সবচেয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়তে পারে। কারণ ইরানের সমুদ্রপথে রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীনে যায়।
একদিকে চীনের জন্য ইরানের তেল গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের নিজস্ব বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ওয়াশিংটন যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যকারী প্রতিষ্ঠান বা দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়, বেইজিংয়ের সামনে নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব তৈরি হবে।
এখানে হরমুজ প্রণালির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। ইরানের তেল রপ্তানির ওপর চাপ এবং একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া—দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাত এখন আর কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বৈশ্বিক তেলবাজার, চীনের জ্বালানি চাহিদা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা।
সামনে আরও বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সংঘাত কতদিন চলবে এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা কতটা দীর্ঘ হবে।
যদি তেল পরিবহন স্বাভাবিক না হয়, তাহলে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়বে। আর সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু তেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পণ্যের মূল্য—সব ক্ষেত্রেই তার প্রতিফলন দেখা দিতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন নিষেধাজ্ঞা। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের পাশাপাশি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও চাপ বাড়ায়, তাহলে সংকটের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।
সব মিলিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক সক্ষমতাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় নির্ধারক। ইরানের জন্য প্রশ্ন এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকা নয়; অর্থনীতিকে সচল রাখা, জনগণের প্রয়োজন মেটানো এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে—ইরানকে চাপে রাখতে গিয়ে যেন সেই চাপ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং চীনের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংঘাতে পরিণত না হয়।

