ঘটনাটি ঘটে ২১ আগস্ট ২০২৬, শুক্রবার দুপুরে। নিহত তরুণের বাবা ৪৮ বছর বয়সী মুরলিধর চন্দগুডে এবং মা সঙ্গীতা চন্দগুডে। একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি নতুন মুঠোফোনকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধ থেকে। শুক্রবার সকাল প্রায় ১০টার দিকে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা-কাটাকাটির পর তরুণটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে খাওয়াদিয়া পাহাড়ে চলে যান। ছেলের এমন আচরণে উদ্বিগ্ন হয়ে তার বাবা-মাও তাকে অনুসরণ করে পাহাড়ে পৌঁছান।
প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বোঝানোর চেষ্টা
পাহাড়ে তরুণটিকে দেখতে পাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত সংকটপূর্ণ হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ, দমকল বাহিনীর সদস্য এবং স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাকে নিরাপদে নামিয়ে আনার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে বোঝানোর চেষ্টা চলতে থাকে।
উদ্ধারকারীরা পাহাড়ের নিচে নিরাপত্তাজাল তৈরিরও চেষ্টা করেন। কিন্তু তরুণটি বারবার পাহাড়ের কিনারার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরে যাচ্ছিলেন। ফলে ঠিক কোন মুহূর্তে তিনি ঝাঁপ দিতে পারেন, তা অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ পরিদর্শক রমেশ্বর গাডের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলছিল। দুপুর ১টার পর বাবা ধীরে ধীরে ছেলের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি ছেলেকে পাহাড়ের কিনারা থেকে সরে আসার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তরুণটি হঠাৎ পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেন। তাকে ধরে ফেলার চেষ্টা করতে গিয়ে তার বাবাও ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান। চোখের সামনে স্বামী ও ছেলেকে পড়ে যেতে দেখে মা সঙ্গীতাও আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। তিনিও পাহাড় থেকে ঝাঁপ দেন।
একটি পারিবারিক বিরোধ মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয় একটি পরিবারের সম্পূর্ণ ধ্বংসের ঘটনায়।
উদ্ধারকারীদের সামনেও ছিল কঠিন পরিস্থিতি
ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকারীদের জন্যও পরিস্থিতিটি ছিল অত্যন্ত জটিল। তরুণটির কাছে সরাসরি গিয়ে তাকে আটকে ফেলার চেষ্টা করলে উদ্ধারকারীদের নিজেদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়তে পারত।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করে দূর থেকে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। সাবেক তিসগাঁও সরপঞ্চ সঞ্জয় যাদবও উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। তার ভাষ্য, প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয়রাও প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে তরুণটিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি কারও কথাই শুনছিলেন না।
এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি নয়, বরং মানসিক সংকটের মুহূর্তে দ্রুত ও কার্যকরভাবে একজন বিপর্যস্ত তরুণের কাছে পৌঁছানোর গুরুত্বও সামনে নিয়ে এসেছে।
মুঠোফোনের বিরোধ কীভাবে এত বড় বিপর্যয়ে গড়াল?
ঘটনার শুরু ছিল একটি নতুন মুঠোফোনকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধ। কিন্তু একটি বস্তু নিয়ে শুরু হওয়া মতবিরোধ কীভাবে একজন তরুণকে এমন চরম সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে গেল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
তদন্তকারীদের সামনে তাই শুধু মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করাই নয়, ঘটনার আগের পারিবারিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তরুণটির মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, এর আগে এমন কোনো আচরণ করেছিলেন কি না এবং পরিবারের সঙ্গে বিরোধের প্রকৃতি কী ছিল—এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসতে পারে।
প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগেও ওই তরুণ একই পাহাড়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় উঠেছিলেন। সে সময় পুলিশ তাকে বুঝিয়ে নিরাপদে নিচে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল।
অর্থাৎ এবারের ঘটনাটি সম্পূর্ণ আকস্মিক ছিল কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একই পাহাড়ে আগেও ঘটেছে প্রাণহানি
খাওয়াদিয়া পাহাড়ের সঙ্গে এমন প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। এলাকাটিতে অতীতেও দুর্ঘটনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
জানুয়ারি ২০২৫-এ সেখানে এক কিশোরীকে হত্যা করে গভীর খাদে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে ব্যায়াম করার সময় পাহাড় থেকে পড়ে আরেক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছিল।
বারবার এমন ঘটনা ঘটলেও পাহাড়ের বিপজ্জনক কিনারায় স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা বা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের কার্যকর উদ্যোগ না থাকার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের মধ্যে পাহাড়ের কিনারায় নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির দাবি থাকলেও এখন পর্যন্ত সেখানে এমন কোনো স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনটি মৃত্যু, কিন্তু প্রশ্ন আরও অনেক
পুলিশ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য পাঠিয়েছে। ওয়ালুজ শিল্পাঞ্চল থানায় অপমৃত্যুর প্রতিবেদন নথিভুক্ত করে ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে।
প্রাথমিক ময়নাতদন্তে তিনজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে গুরুতর আঘাত, শরীরের বিভিন্ন হাড় ভেঙে যাওয়া এবং ব্যাপক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে।
চন্দগুডে পরিবার ছত্রপতি সম্ভাজিনগরের জালতা ফাটা এলাকায় বসবাস করত। তাদের আদি বাড়ি মহারাষ্ট্রের জলনা জেলার ধনগর পিম্পলগাঁও গ্রামে।
একটি মুঠোফোন নিয়ে শুরু হওয়া পারিবারিক বিরোধ যে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি পরিবারের তিনটি প্রাণ কেড়ে নেবে, তা কেউ হয়তো কল্পনাও করেননি। কিন্তু ঘটনাটি দেখিয়ে দিল, সংকটের মুহূর্তে একটি মানুষের আচরণ কত দ্রুত ভয়াবহ দিকে মোড় নিতে পারে।
আর পাহাড়ের কিনারায় কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় এমন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তাই তদন্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে পাহাড়টির ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

