দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেওয়ার লক্ষ্যে দেশটির অভিবাসী কর্মী ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম সম্প্রতি ২৫টি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। গত শুক্রবার প্রকাশিত এই তালিকা ঘিরে প্রবাসী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া পুনরায় চালুর সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে, যদিও এখনো এ বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
এফডব্লিউসিএমএসের প্রকাশিত তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি, মেসার্স ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস, অ্যানেসা এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, আত-তাকওয়া ওভারসিজ লিমিটেড, আর্থ-স্মার্ট বাংলাদেশ লিমিটেড, খান জাহান আলী ওভারসিজ, মেসার্স আল-শোতুপ ওভারসিজ, মাদারল্যান্ড ওভারসিজ লিমিটেড, রিফা ইন্টারন্যাশনাল, ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল, আল-হায়াত ওভারসিজ, ভালুকা ওভারসিজ, ব্রাদার্স ট্রেডিং অ্যান্ড কন্ট্রাক্টিং লিমিটেড, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি, গুডনেস সার্ভিসেস লিমিটেড, জুয়েল রিঙ্কু এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার লিঙ্ক, নেবারস অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেড, তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এবং অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন।
তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের পরিচিত ও তুলনামূলক নতুন বেশ কয়েকটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। এই এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কবে থেকে এই প্রক্রিয়া কার্যকর হবে, কর্মী বাছাইয়ের পদ্ধতি কেমন হবে এবং কী মানদণ্ডে এই ২৫টি প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হলো, তা নিয়ে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।
এই খবরের গুরুত্ব বুঝতে হলে পেছনের প্রেক্ষাপট জানা জরুরি। ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। এর ঠিক পরদিন থেকেই নতুন করে বিদেশি কর্মী প্রবেশের সব সুযোগ বন্ধ করে দেয় দেশটি। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বহু বাংলাদেশি কর্মী চরম দুর্ভোগে পড়েন। অনেকের হাতে বিমানের টিকিট থাকা সত্ত্বেও তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। কেউ কেউ বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছেও দেশে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সে সময় প্রায় সতেরো হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারেননি। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে প্রায় আট হাজার কর্মীকে নতুন করে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় মালয়েশিয়া সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই সিদ্ধান্তের পরও তাদের একটি বড় অংশ এখনো মালয়েশিয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এখনো প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী এই অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছেন।
শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পর থেকে এটি পুনরায় খোলার জন্য দফায় দফায় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি বললেই চলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। সে সময় প্রবাসীকল্যাণ বিষয়ক দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টাও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালান। তবে সেসব উদ্যোগেও বাজারটি সম্পূর্ণভাবে সচল করা যায়নি।
পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরেই মালয়েশিয়া যান তিনি। এই সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার আবার খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন করে ইতিবাচক প্রত্যাশা তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই সরাসরি যোগাযোগই সাম্প্রতিক অগ্রগতির অন্যতম কারণ হতে পারে। সফরের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা আরও গতি পায়, যার একটি বাস্তব ফলাফল হিসেবে এখন এই ২৫ এজেন্সির তালিকা সামনে এসেছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু তালিকা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়। বাস্তবে কর্মী পাঠানোর সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, খরচের কাঠামো, প্রতারণা রোধে তদারকি ব্যবস্থা এবং আগে আটকে পড়া কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ কর্মীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা কাটবে না। অতীতে সিন্ডিকেট-কেন্দ্রিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছিল, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়নের দাবিও উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সম্পূর্ণভাবে খুলবে কি না এবং কবে থেকে নতুন নিয়োগ শুরু হবে— এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো অজানা। তবে ২৫টি এজেন্সির তালিকা প্রকাশ এই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটানোর একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে সরকারি পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে হাজারো প্রত্যাশী কর্মীর ভবিষ্যৎ।

