দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে একটি যুগান্তকারী আইন, যার মাধ্যমে অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্করা নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ‘মৃত্যুতে সহায়তা’ পাওয়ার আইনি অধিকার পেলেন। দেশটির সাংবিধানিক পরিষদ আইনটি অনুমোদন দেওয়ার পর তা সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয়।
এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও কানাডার মতো দেশের তালিকায় যুক্ত হলো ফ্রান্স, যেখানে ইতিমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। উল্লেখ্য, ফরাসি কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ইউথানেসিয়া’ শব্দের বদলে ‘মৃত্যুতে সহায়তা’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে।
গত বুধবার প্রকাশিত এই আইন অনুযায়ী, ফ্রান্সের নাগরিক বা দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে বসবাসকারী নির্দিষ্ট বয়সের ব্যক্তিরা, যাঁরা গুরুতর ও দুরারোগ্য অসুস্থতায় ভুগছেন এবং তা তাঁদের জন্য অসহনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাঁরা এই সুবিধা পাওয়ার আইনি ভিত্তি পেলেন। তবে প্রক্রিয়া শুরুর আগে একজন চিকিৎসককে অবশ্যই রোগীর যোগ্যতা যাচাই করে নিশ্চিত হতে হবে যে তিনি নির্ধারিত শর্তগুলো পূরণ করছেন কি না।
অনুমোদন পাওয়ার পরও রোগীকে অন্তত দুই দিন অপেক্ষা করতে হবে, এবং নির্ধারিত দিনে চূড়ান্তভাবে তাঁর সিদ্ধান্ত পুনরায় নিশ্চিত করতে হবে। আইনে বলা হয়েছে, প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়ে রোগী চাইলে তাঁর সম্মতি প্রত্যাহার করতে পারবেন। সাধারণত রোগীকে নিজ হাতেই প্রাণঘাতী উপাদান গ্রহণ করতে হবে, তবে শারীরিকভাবে অক্ষম হলে একজন স্বাস্থ্যকর্মী তাঁকে সহায়তা করতে পারবেন।
এর আগে পর্যন্ত ফ্রান্সে শুধু নিষ্ক্রিয় পদ্ধতি—যেমন কৃত্রিম জীবনরক্ষাব্যবস্থা প্রত্যাহার বা গভীর চেতনানাশক প্রয়োগ—অনুমোদিত ছিল। যাঁরা সক্রিয়ভাবে জীবনের শেষ মুহূর্তে সহায়ক মৃত্যুর বিকল্প খুঁজতেন, তাঁদের বাধ্য হয়েই অন্য দেশে যেতে হতো, যেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা আগে থেকেই বৈধ।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, যিনি দুই হাজার বাইশ সালের পুনর্নির্বাচনী প্রচারে এমন আইনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই অগ্রগতিকে স্বাগত জানিয়ে একে দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আলোচনার একটি অর্থবহ পরিণতি হিসেবে বর্ণনা করেন। আইনের খসড়া তৈরিতে যুক্ত ছিলেন এক মধ্যপন্থী সংসদ সদস্য, যিনি এটিকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করেছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকেও বলা হয়েছে, এই আইন নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং এখন তা সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক, নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাস্তবায়িত হতে পারবে।
তবে সবাই এই আইনকে সাদরে গ্রহণ করেননি। বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতাযুক্ত ব্যক্তিদের সেবাদানকারী একটি সংস্থা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে, আর বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের মতে এই আইন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংসদে এই বিল নিয়ে বিতর্কের সময় সব সদস্যকে দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে নিজ বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিনের ক্যাথলিক ঐতিহ্যবাহী দেশ হিসেবে পরিচিত ফ্রান্সে এই বিষয়টি বরাবরই স্পর্শকাতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, এমনকি কিছু স্বাস্থ্যকর্মীও এর বিরোধিতা করেছেন।
গেজেটে প্রকাশের আগে আইনটিকে একাধিক আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সমালোচকদের মূল যুক্তি ছিল, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বরাদ্দ ন্যূনতম দুই দিনের সময়সীমা যথেষ্ট নয়, আর নৈতিক বা ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে গোটা কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানেরই এই প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যানের সুযোগ থাকা উচিত।
গত শুক্রবার ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ আইনটি মূলত বহাল রাখলেও কিছু বিধানের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করার নির্দেশ দেয়, যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘বিবেক সংক্রান্ত ধারা’—যার আওতায় স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীরা চাইলে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পারবেন।
পরিষদ আইনের কোনো অংশ পুরোপুরি বাতিল করেনি, তবে নির্দেশনা দিয়েছে যে আবেদন পর্যালোচনার সময় চিকিৎসকদের রোগীর আইনি অভিভাবকদের মতামতও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের পাশাপাশি ফার্মাসিস্টরাও এখন থেকে এই বিবেক সংক্রান্ত ধারার সুবিধা প্রয়োগ করতে পারবেন।
এ ছাড়া পরিষদ স্পষ্ট করে জানিয়েছে, বেসরকারি ও ধর্মভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোও চাইলে এই ধারার আওতায় সহায়ক মৃত্যু প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে পারবে, যদি তা তাদের নীতির পরিপন্থী হয়। তবে শর্ত হলো, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেই প্রতিষ্ঠানই যেন একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না হয়, যাতে স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন অপূর্ণ না থেকে যায়।

