ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আগে ও যুদ্ধ চলাকালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাস থেকে সরিয়ে নেওয়া কূটনীতিকদের আবারও ওই অঞ্চলে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এই উদ্যোগকে ইরানের সঙ্গে শিগগিরই নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাতে জড়ানোর পরিকল্পনা না থাকার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস
দ্য টাইমসের হাতে আসা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতে ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তাদের পুনরায় দায়িত্বে পাঠানো এবং যুদ্ধকালীন জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থাগুলো ধীরে ধীরে শিথিল করার কাজ চলতি সপ্তাহেই শুরু হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিন মার্কিন কর্মকর্তাও সংবাদমাধ্যমকে এ ধরনের পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা আবারও ব্যর্থ হলেও দূতাবাসগুলোতে কর্মী ফেরানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে আলোচনা ভেস্তে গেলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকিও দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিতে বলা হয়েছে, যেসব কূটনৈতিক মিশনে কর্মীসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েল, লেবানন, সৌদি আরব, কাতার, জর্ডান, ওমান, ইরাক ও কুয়েত।
এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কূটনৈতিক মিশনগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়। সর্বশেষ মূল্যায়নের ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিশনে কর্মী মোতায়েনের অবস্থান পরিবর্তন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য বাস্তবায়নের কাজও চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে দপ্তরটি।
গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর এক দিন আগে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাসের অত্যাবশ্যকীয় নয় এমন কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সরকারি খরচে ইসরায়েল ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
এর পরের কয়েক সপ্তাহে ইরান ও দেশটির আঞ্চলিক মিত্ররা সৌদি আরব, কুয়েত ও ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ও রকেট হামলা চালায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মিশন থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কয়েকটি দেশের মার্কিন কূটনীতিকদের দূতাবাসে না গিয়ে নিজ নিজ বাসা থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমান ও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, কর্মীদের আবার দায়িত্বস্থলে পাঠানোর সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও গত সপ্তাহে শেষ হওয়া ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি আরও বাড়ানো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা এখনো স্থবির হয়ে আছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় ইসরায়েলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং জো বাইডেন প্রশাসনের সময় মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ড্যান শাপিরো বলেন, যেসব কূটনৈতিক মিশন থেকে আংশিকভাবে কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে তাদের আবার ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের অর্থ হলো প্রশাসন মনে করছে যুদ্ধের অবসান ঘটছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি অনুযায়ী, প্রথম ধাপে লেবাননে মার্কিন দূতাবাসে কূটনীতিকদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তবে সেখানে একসঙ্গে পুরো কর্মীসংখ্যা ফেরানো হবে না। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েল, জর্ডান ও ওমানের তিনটি দূতাবাসে পুরো কর্মীসংখ্যা ফিরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও লেবাননের মার্কিন মিশনগুলোতে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ কর্মী রাখা হবে। অন্যদিকে ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের মিশনে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ কর্মী রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে উপসাগরীয় ছয়টি দেশ ও লেবাননে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন আর. বাস বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার ওপর বিধিনিষেধ বহাল রাখার বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে মার্কিন সরকার এখনো ওই অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকি দেখছে।
তার মতে, ৩০, ৬০ বা ৯০ দিন আগের তুলনায় হুমকি কমেছে। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় ঝুঁকি এখনো বেশি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়া কয়েকজন কূটনীতিক তাদের পরবর্তী দায়িত্ব কোথায় হবে, সে বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তার সন্তান রয়েছে এবং নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে তাদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল, তারা বিষয়টি নিয়ে বেশি তৎপর ছিলেন। তবে এই চাপ মার্কিন সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কতটা প্রভাব ফেলেছে, কিংবা আদৌ কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, কূটনীতিক এবং তাদের পরিবারের কিছু সদস্যকে আবার মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে আগ্রহী—এমন একটি বার্তা দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিকটপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রবার্ট ড্যানিন বলেন, দূতাবাসের কর্মীদের আবার দায়িত্বস্থলে পাঠানোর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকবে।
এ বছরের শুরুর দিকে দূতাবাসগুলো থেকে কর্মী সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একবার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, প্রয়োজনে আবারও সেটি নিতে পারে।

