যুদ্ধের সবচেয়ে স্বাভাবিক উদ্দেশ্য কী? জয়।
কিন্তু এমনও কি হতে পারে, যেখানে যুদ্ধের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় এমন এক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা যার কারণে যুদ্ধ শেষ করাটাই শাসকের জন্য নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে?
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে আজ এই প্রশ্নটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ইউক্রেনের রণাঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সংঘাত, সীমিত ভূখণ্ডগত অগ্রগতি, বিপুল সামরিক ব্যয় এবং ক্রমবর্ধমান প্রাণহানির পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে রাশিয়ার জন্য কি দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয়ই সবচেয়ে সুবিধাজনক, নাকি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধও মস্কোর ক্ষমতাকাঠামোর জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করেছে?
এর সরল উত্তর হলো রাশিয়া জিততে চায় না, এমন দাবি প্রমাণ করা কঠিন। বরং রাশিয়া এখনো তার যুদ্ধের মৌলিক রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলো থেকে সরে আসেনি। ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা, ভূখণ্ডগত দাবি এবং রুশ নিরাপত্তা-স্বার্থের প্রশ্নে মস্কোর অবস্থান এখনো কঠোর।
তবে এর পাশাপাশি আরেকটি বাস্তবতাও স্পষ্ট: দীর্ঘ যুদ্ধ রাশিয়ার রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামোকে এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে যুদ্ধ হঠাৎ শেষ হলে নতুন ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধ থেকে তৈরি হয়েছে ‘ওয়ার ইকোনমি’
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, রাশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত ভেঙে পড়বে। বাস্তবে তা হয়নি। রাশিয়া তার জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ ইউরোপ থেকে সরিয়ে এশিয়ার দিকে নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার তেল রপ্তানি পুরোপুরি ধসে পড়েনি; বরং এর প্রধান গন্তব্য দ্রুত বদলে গেছে। ইউরোপের অংশ কমে গিয়ে এশীয় বাজারের গুরুত্ব বেড়েছে।
কিন্তু এখানেই একটি ভুল ধারণা এড়িয়ে চলা জরুরি।
যুদ্ধ মানেই রাশিয়ার জন্য অবিরাম তেল-সমৃদ্ধি এমন নয়। নিষেধাজ্ঞা, মূল্যসীমা, পরিবহন ব্যয় এবং ছাড় দিয়ে তেল বিক্রির কারণে রাশিয়ার ওপর চাপও তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ধারাবাহিকভাবে রাশিয়ার জ্বালানি আয়ের পথ সংকুচিত করার চেষ্টা করেছে এবং ২০২৫-২৬ সালে তেলের মূল্যসীমা আরও কঠোর করেছে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ রাশিয়াকে শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা দেয়নি; বরং অর্থনীতিকে যুদ্ধের প্রয়োজনের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
অস্ত্র কারখানা, কর্মসংস্থান এবং কৃত্রিম প্রবৃদ্ধি
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের কাঠামোয়।
অস্ত্র, গোলাবারুদ, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে বিপুল সরকারি অর্থ ঢালা হয়েছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা শিল্প রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালে রাশিয়ার সামরিক ব্যয় প্রায় ১৬ ট্রিলিয়ন রুবল বা জিডিপির প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছায় বলে স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ব্যয় কারখানা চালু রেখেছে, শ্রমবাজারে চাহিদা তৈরি করেছে এবং বহু মানুষের আয় বাড়িয়েছে।কিন্তু যুদ্ধ অর্থনীতির একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির সমার্থক নয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আগেই সতর্ক করেছে যে রাশিয়ার যুদ্ধকালীন প্রবৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বিপুল সরকারি ব্যয়, অত্যন্ত সংকুচিত শ্রমবাজার এবং উচ্চ মজুরি। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অর্থনীতি অতিরিক্ত উত্তপ্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে।
অর্থাৎ, যুদ্ধ অর্থনীতিকে সচল রাখছে কিন্তু সেই সচলতার মূল্যও অত্যন্ত বেশি।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ, ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ তত সহজ?
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুধু অর্থনীতি বদলায় না, রাজনীতিও বদলায়।
যখন কোনো রাষ্ট্র নিজেকে বহিরাগত হুমকির মুখে উপস্থাপন করে, তখন জাতীয় নিরাপত্তা, দেশপ্রেম এবং রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা সামাজিক অসন্তোষের মতো বিষয় অনেক সময় দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়।
রাশিয়ার ক্ষেত্রেও যুদ্ধকে শুধু ভূখণ্ডের লড়াই হিসেবে নয়, পশ্চিমা প্রভাব ও নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর অস্তিত্বের সংগ্রাম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই ধরনের পরিবেশ ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য দ্বিমুখী সুবিধা তৈরি করে।
প্রথমত, বিরোধী কণ্ঠকে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে দুর্বল করা সহজ হয়।
দ্বিতীয়ত, জনগণের মধ্যে ‘বহিরাগত শত্রু’র ধারণা রাষ্ট্রীয় সংহতি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।
তবে এটিও বলা যাবে না যে যুদ্ধের কারণে রাশিয়ায় সব ধরনের অসন্তোষ অদৃশ্য হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি, শ্রমিক সংকট এবং বাজেটচাপ রাশিয়ার জন্য বাস্তব সমস্যা হিসেবেই রয়ে গেছে।
যুদ্ধ শেষ হলে আরেকটি বড় প্রশ্ন; যুদ্ধফেরত সেনারা
দীর্ঘ যুদ্ধের আরেকটি জটিলতা হলো বিপুল সংখ্যক সেনাসদস্য ও যুদ্ধফেরত মানুষের ভবিষ্যৎ।
রাশিয়া কারাগার থেকে বিপুলসংখ্যক বন্দিকে যুদ্ধের জন্য নিয়োগ করেছে। বিভিন্ন অনুসন্ধানী তথ্যের ভিত্তিতে ২০২২ সালের পর থেকে আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার বন্দিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি ‘লাখ লাখ’ হওয়ার প্রমাণ নেই, কিন্তু সংখ্যাটি নিজেই যথেষ্ট বড়।
যুদ্ধ শেষ হলে এই সেনাদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক পুনঃএকীকরণ একটি বড় রাষ্ট্রীয় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
তবে এটাও বলা যাবে না যে, শুধু যুদ্ধফেরত সেনাদের ব্যস্ত রাখার জন্যই রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। বরং বলা বেশি যুক্তিসংগত যে যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, যুদ্ধফেরত সমাজকে সামলানোর ভবিষ্যৎ সমস্যাটিও তত বড় হয়ে উঠছে।
যুদ্ধ তৈরি করেছে নতুন আন্তর্জাতিক নির্ভরতা
এই যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ফলগুলোর একটি হলো রাশিয়ার নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়া চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অস্ত্র, গোলাবারুদ এবং সামরিক সহায়তার বিনিময়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্ব এখন আর শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এটি নিরাপত্তা সহযোগিতার নতুন কাঠামো।
চীনের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। বেইজিং সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক যুদ্ধকালীন রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফলে যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনের মাটিতে লড়াই নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি নতুন আন্তর্জাতিক মেরুকরণের পরীক্ষাক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে।
তাহলে কি রাশিয়ার আসল লক্ষ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া?
এখানেই সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি বোঝা জরুরি।
রাশিয়া জিততে চায় না এ কথা বলার মতো শক্ত প্রমাণ নেই।
বরং মস্কো এখনো এমন রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত শর্তে যুদ্ধ শেষ করতে চায়, যা ইউক্রেন এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের জন্য গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার ভেতরে এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যা যুদ্ধকে শুধু সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।
যুদ্ধ এখন
- রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতির অংশ,
- সামরিক উৎপাদনের চালিকাশক্তি,
- রাজনৈতিক সংহতির হাতিয়ার,
- আন্তর্জাতিক জোট পুনর্গঠনের মাধ্যম,
- এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণে সহায়ক একটি বাস্তবতা।
সুতরাং, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে শুধু ‘জয়’ ও ‘পরাজয়’-এর প্রচলিত সমীকরণে দেখলে পুরো ছবিটি বোঝা যাবে না। সম্ভবত বাস্তবতা আরও জটিল।
রাশিয়া যুদ্ধ জিততে চায় কিন্তু এমন এক পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে, যেখানে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও যুদ্ধ অর্থনীতির জন্য কিছু সুবিধা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই শান্তি এখন শুধু কূটনৈতিক সমঝোতার প্রশ্ন নয়।
শান্তি মানে যুদ্ধ অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস।
শান্তি মানে লাখো মানুষের যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্বাসনের প্রশ্ন।
শান্তি মানে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের নতুন বাস্তবতা।
শান্তি মানে জনগণের সামনে আবার মূল্যস্ফীতি, আয়, দুর্নীতি এবং জীবনযাত্রার প্রশ্নগুলো আরও জোরালোভাবে ফিরে আসা।
অর্থাৎ, যুদ্ধ শুরু করা কঠিন কিন্তু কখনো কখনো যুদ্ধ শেষ করাও ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রের জন্য কম কঠিন নয়।
ইউক্রেনের রণাঙ্গনে তাই আজ শুধু কামান ও ক্ষেপণাস্ত্রের যুদ্ধ চলছে না। সেখানে পরীক্ষা হচ্ছে একটি যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থারও যে ব্যবস্থা যুদ্ধের মধ্যেই নিজের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সাজিয়ে ফেলেছে।
আর সম্ভবত এ কারণেই শান্তির পথ যতটা সহজ বলে মনে হয়, বাস্তবে তা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

