বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের অবস্থান গত কয়েক দশকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় যে দেশটি নিজেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরত, আজ সেই দেশই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী খেলোয়াড়। আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের বহু দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে চীন নিজেকে বৈশ্বিক দক্ষিণের স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে—চীনের এই নেতৃত্বের দাবি কি সত্যিই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নতুন ন্যায্য বিশ্বব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা, নাকি বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যেই নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার একটি কৌশল?
চীনের বর্তমান অবস্থান বুঝতে হলে তার ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। ১৮২০ সালে চিং সাম্রাজ্যের সময় চীন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির অধিকারী দেশগুলোর একটি। ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে তখন বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা শক্তি ও জাপানের আগ্রাসন, অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের কারণে দেশটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যায়, যা চীনের ইতিহাসে “অপমানের শতাব্দী” হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং ১৯০৩ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতিতে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ, ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
কিন্তু ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াওপিংয়ের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর চীন নতুন গতিতে এগিয়ে যেতে শুরু করে। এর ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। ২০১০ সালের মধ্যে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক উৎপাদন খাতে চীনের অংশ ৩০ শতাংশের বেশি হয়েছে, যেখানে ১৯৪৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ছিল ৫০ শতাংশের বেশি, যা পরে কমে প্রায় ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
চীনের এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করলে দুই দেশের বাণিজ্য সংঘাত নতুন মাত্রা পায়। এর প্রভাব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০১৮ সালের প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে চীনা পণ্যের একটি বড় অংশ মেক্সিকো ও কানাডার মতো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশ করছে।
এই পরিস্থিতিতে চীন প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বনির্ভর হওয়ার দিকে মনোযোগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প উপকরণ এবং বিরল খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নিয়ে। বিশ্বের উন্নত কম্পিউটিং সক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশ এই দুই দেশের হাতে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব অনেকাংশে নির্ভর করবে কে এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায় তার ওপর।
চীন দ্রুত এগিয়ে আসছে এবং তুলনামূলক কম খরচের প্রযুক্তি উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০২৪ সালে চীনের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায় এবং ২০২৫ সালে চীনা গবেষকদের প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও জাপানের গবেষকদের সম্মিলিত সংখ্যার সমান ছিল।
চীনের অনেক নীতিনির্ধারক মনে করেন “পূর্বের উত্থান এবং পশ্চিমের পতন” শুরু হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র আরও জটিল। বিশাল ঋণ থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ। প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারের নামমাত্র অর্থনীতি নিয়ে দেশটি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধরে রেখেছে। আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রায় অর্ধেক এখনো ডলারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
এছাড়া সামরিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও এগিয়ে রয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার মার্কিন সেনা ১৭৮টি দেশে মোতায়েন রয়েছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান অভিবাসন কেন্দ্র এবং বহু সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পেছনে বিদেশি উদ্যোক্তাদের অবদান রয়েছে।
যদিও চীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে দেশটি এখনো বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রকৃত নেতা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং চীন একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক অংশীদার, যে মূলত নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে চীনের সস্তা পোশাক রপ্তানি স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করেছে। একইভাবে চিলি ও পেরুর সঙ্গে চীনের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও সমালোচনা রয়েছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে এসব সম্পর্ক কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্পকে দুর্বল করেছে।
আরেকটি বড় অভিযোগ হলো, চীন উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ভাগাভাগিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখায়নি। অথচ এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
চীন নিজেকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যেই নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার বিষয়টি চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা অনেক সময় বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর প্রত্যাশার চেয়েও বেশি গুরুত্ব পায়।
আন্তর্জাতিক সংকটেও চীনের অবস্থান অনেক সময় সতর্ক ও হিসাবভিত্তিক। উদাহরণ হিসেবে, ভেনেজুয়েলা ও ইরান ইস্যুতে চীনের প্রতিক্রিয়া অনেকের কাছে প্রত্যাশার তুলনায় সীমিত মনে হয়েছে।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে চীনের উন্নয়ন যাত্রা বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, শিল্পায়ন এবং প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সক্ষমতা চীনের বড় অর্জন।
তবে একই সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক কাঠামো, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক নীতির কারণে অনেক দেশ তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সমালোচকদের মতে, চীন এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরির চেয়ে যেখানে সব দেশের সমান সুযোগ থাকবে, সেখানে নিজের জাতীয় স্বার্থ ও প্রভাব রক্ষায় বেশি মনোযোগী।
চীন নিঃসন্দেহে ২১ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। তার অর্থনৈতিক অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রকৃত নেতা হওয়ার জন্য শুধু অর্থনৈতিক শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আস্থা, সমতা, প্রযুক্তি ভাগাভাগি এবং অন্য দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের প্রতি প্রতিশ্রুতি।
বর্তমান বাস্তবতায় চীনকে হয়তো একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক অংশীদার বলা যায়, কিন্তু বৈশ্বিক দক্ষিণের সর্বজনস্বীকৃত প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে দেশটিকে আরও অনেক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

