ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে রাশিয়ার ড্রোন হামলার পর একটি অস্ত্র ও গোলাবারুদের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৪২ জন। হামলার পর আগুন দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং আবাসিক ভবনসহ বেশ কিছু স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
ঘটনাটি ঘটে কিয়েভের পশ্চিমে বুচা জেলার মিলা এলাকায়। শুক্রবার রাতে রুশ ড্রোনের আঘাতে একটি স্থাপনায় আগুন ধরে যাওয়ার পর সেখানে রাখা গোলাবারুদে একের পর এক বিস্ফোরণ শুরু হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের বসতবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনাতেও এর প্রভাব পড়ে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, অন্তত ৫০টি আবাসিক ভবন কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রথম দিকে কিয়েভ অঞ্চলের গভর্নর তিমুর তাকাচেঙ্কো ২৭ জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। পরে উদ্ধার তৎপরতা চলার মধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৭ জনে দাঁড়ায়। আহত হয়েছেন ৪২ জন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। হামলার পর কয়েকশ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের ধারণ করা ছবি ও ভিডিওতে ধ্বংসস্তূপ, পুড়ে যাওয়া যানবাহন এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের চিত্র দেখা গেছে। উদ্ধারকারী দল দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ করে।
এই হামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক শুধু রুশ ড্রোনের আঘাত নয়, বরং আবাসিক এলাকার এত কাছে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও গোলাবারুদ সংরক্ষণ করা হয়েছিল কেন—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ড্রোনের আঘাতে যে স্থাপনায় প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে, সেখানে গোলা, মাইন, অন্যান্য গোলাবারুদ এবং ড্রোন রাখা ছিল। তাঁর অভিযোগ, এসব বিস্ফোরক মানুষের বসতবাড়ির এত কাছে রাখার অনুমতি দেওয়া গুরুতর অবহেলার বিষয়।
জেলেনস্কি আরও বলেছেন, যারা এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। ঘটনার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে ফৌজদারি তদন্তও শুরু হয়েছে। তদন্তে ওই স্থাপনায় বিস্ফোরক সামগ্রী সংরক্ষণের অনুমতি ও নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, সেটিও দেখা হচ্ছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ফলে সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্রের গুদামগুলো রুশ হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য—এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এমন একটি স্থাপনা যদি জনবসতির কাছাকাছি থাকে, তাহলে সেখানে হামলা হলে সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
এই ঘটনাই সেই ঝুঁকিকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ ড্রোনের আঘাতের পর মূল ক্ষয়ক্ষতি শুধু গুদামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিস্ফোরিত গোলাবারুদের প্রভাবে আশপাশের বাড়িঘর ও অন্যান্য স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধারকারী ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের জন্যও এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে শত শত জরুরি সেবাকর্মী কাজ করেছেন। বিপজ্জনক বিস্ফোরক থাকার কারণে উদ্ধারকাজও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ একসঙ্গে চালাতে হয়েছে।
কিয়েভের আশপাশে গোলাবারুদ সংরক্ষণস্থলে হামলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। কয়েক সপ্তাহ আগেও কিয়েভের কাছে ভিশনেভ এলাকায় একটি গোলাবারুদের গুদামে রুশ হামলার পর বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায়ও প্রাণহানি হয়েছিল।
সাম্প্রতিক ঘটনার পর ইউক্রেনের সরকার এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সামনে তাই শুধু হামলার তদন্ত নয়, সামরিক সরঞ্জাম সংরক্ষণের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একটি যুদ্ধ চলাকালে শত্রুপক্ষের হামলা পুরোপুরি ঠেকানো কঠিন হলেও, সামরিক স্থাপনার অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যাতে বেসামরিক প্রাণহানিকে আরও বাড়িয়ে না দেয়, সেই প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই প্রাণঘাতী ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন রাশিয়া ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিকভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত রাশিয়া বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়।
কিয়েভ ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে রুশ হামলার চাপ বেড়েছে। একের পর এক আকাশ হামলা ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে বেসামরিক অবকাঠামো ও জনবসতিতে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
এই হামলায় ৩৭ জনের মৃত্যু চলতি বছরে কিয়েভ অঞ্চলে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি যুদ্ধের সরাসরি ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি সামরিক সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনা ও বেসামরিক নিরাপত্তার মধ্যকার বড় দুর্বলতাকেও সামনে এনেছে।
এখন ইউক্রেনের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ। একদিকে রুশ হামলা মোকাবিলা করে সামরিক স্থাপনা ও অস্ত্র সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা, অন্যদিকে এসব স্থাপনা যাতে জনবসতির জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি না করে তা নিশ্চিত করা। মিলা এলাকার ভয়াবহ বিস্ফোরণ সেই চ্যালেঞ্জের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।

