ভূমিকম্প ও পাহাড়-ভবন ধসের পর সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো দ্রুত ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করা, যা করতে গিয়ে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয় উদ্ধারকর্মীদের। তবে সেই কাজ সহজ করতে ‘সাইবর্গ পতঙ্গ’ বা ‘প্যারাবর্গ’ তৈরি করছেন একদল বায়োরোবোটিক্স প্রকৌশলী। ক্যামেরা ও অতি ক্ষুদ্রাকৃতির মেডিকেল ইনজেক্টর সংযোগওয়ালা ছয় পা বিশিষ্ট এই রোবট-তেলাপোকা দুর্ঘটনার পর অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে ভূমিকা রাখবে। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের বায়োরোবোটিক্স গবেষকরা নিউ সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির (ইউএনএসডব্লিউ) বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে যৌথভাবে এটি উদ্ভাবনে কাজ করছেন। ভেঙে পড়া ভবন, গুহা বা উদ্ধারকারীদের জন্য বিপজ্জনক—এমন স্থানে আটকে পড়া মানুষদের কাছে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই রোবট-তেলাপোকার নকশা করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের বায়োরোবোটিক্স প্রকৌশলী থাং ভো-ডোয়ান বলেন, এ গবেষণা সাইবর্গ পতঙ্গকে কেবল চলমান সেন্সর বা তথ্য সংগ্রাহক হিসেবে না রেখে ক্ষুদ্র এক ‘ফার্স্ট রেসপন্ডার’ বা জরুরি উদ্ধারকারী হিসেবে রূপান্তর করছে। এ ক্ষেত্রে জটিল বা গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সম্পর্কিত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত মানুষের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
তিনি আরও বলেন, গত কয়েক দশক ধরে সাইবর্গ পতঙ্গগুলোকে কেবল অনুসন্ধান ও অভিযানের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আমরা এর পরবর্তী ধাপে যেতে চেয়েছিলাম। একবার যদি এরা কোনো আটকে পড়া মানুষকে খুঁজে পায়, তবে কি এরা বাস্তবেও তাদের সাহায্য করতে পারে?
গবেষণার অংশ হিসেবে ফার নর্থ কুইন্সল্যান্ডের বিশেষ প্রজাতির গর্ত খোঁড়া তেলাপোকার দেহে হালকা ওজনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ ও ক্যামেরা যোগ করা হয়েছে। সাইবর্গ তেলাপোকাগুলোর দেহে এ প্রজাতিটির উপযোগী করে বিশেষভাবে তৈরি ও দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ‘অটো-ইনজেকশন’ ব্যবস্থা যোগ করেছেন গবেষকরা।
গবেষক থাং ভো-ডোয়ান বলেন, প্রাকৃতিক বায়োমেকানিকসের এমন সংযোজন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের কাছে উদ্ধারকারীদের সরাসরি পৌঁছানো অসম্ভব হলে সময়মতো জরুরি চিকিৎসা সহায়তা দিতে সাহায্য করবে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় উঠে এসেছে, লক্ষ্যবস্তুর ১৫ সেন্টিমিটারের মধ্যে থেকে ইনজেকশন দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব প্যারাবর্গ ৯৫ শতাংশ সফলতা পেয়েছে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ নেভিগেশন ও ইনজেকশন দেওয়ার যৌথ কার্যক্রমে সাফল্যের হার ছিল ৭২ শতাংশ।
গবেষণা দলটির আগের বিভিন্ন সাইবর্গ পতঙ্গ মডেলের মতোই ইলেকট্রোড ও মাইক্রোচিপ বসানোর সময় তেলাপোগুলোকে অচেতন করে নেওয়া হয়। কাজ শেষে এসব ডিভাইস সরিয়ে নিলে সাধারণ তেলাপোকার মতোই স্বাভাবিক জীবনযাপন করে এরা।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউয়ের প্রধান টিম হাসিওটিস বলেন, এ প্রযুক্তি উদ্ধারকারী দলের সক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেবে। এসব সাইবর্গ পতঙ্গ সংকীর্ণ স্থানে প্রবেশ করে আহতদের অবস্থান শনাক্ত ও জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারে। তবে শহরের অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এসব তেলাপোকা।
ভো-ডোয়ান আরও বলেন, আমদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিশেষায়িত সাইবর্গ পতঙ্গের পুরো ঝাঁক নামানো, যেখানে প্রতিটি পতঙ্গ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আমরা জরুরি পরিস্থিতিতে সাইবর্গ পতঙ্গের উদ্ধারকারী দল মোতায়েন হতে দেখব।

