ইরানে চলমান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে না। দেশটির ভেতরে ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার মতপার্থক্যও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটা হবে—এই প্রশ্নে ইরানের রাজনৈতিক মহল স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত।
চার দশকেরও বেশি আগে ইরাকের সঙ্গে দীর্ঘ যুদ্ধে ইরান এমনই এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছিল। ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বড় সাফল্য আসার পরও তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি যুদ্ধ থামানোর বদলে আরও এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত ছয় বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতে রূপ নেয়, যেখানে কয়েক লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।
সেই যুদ্ধ আধুনিক ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক মানসিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে। এবারও যুদ্ধের ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর একই ধরনের প্রশ্ন সামনে এসেছে—সামরিক চাপের মধ্যেও লড়াই চালিয়ে যাবে ইরান, নাকি আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছাবে?
তবে এবার পরিস্থিতি আরও জটিল। যুদ্ধের পরবর্তী পথ নিয়ে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আর এই বিভক্তির মধ্যে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে খুব বেশি অবস্থান না নিয়ে আড়ালে রয়েছেন।
ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ প্রকাশ্যে দাবি করছে, দেশটি যুদ্ধে পরাজিত হয়নি; বরং তারা নিজেদের বিজয়ী মনে করছে। কিন্তু বিজয়ের পর কী করা উচিত, তা নিয়েই মূল বিরোধ।
একদিকে রয়েছেন তুলনামূলক বাস্তববাদী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি অংশ। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
তাঁরা একটি চূড়ান্ত সমঝোতার পক্ষে। তাঁদের যুক্তি, দীর্ঘ যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে, মার্কিন নৌ অবরোধ দেশের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই পক্ষের ধারণা, এখনো ইরানের হাতে তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থেকে আলোচনায় যাওয়ার সুযোগ আছে। সেই সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই যুদ্ধের একটি রাজনৈতিক সমাধান করা উচিত।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান চলতি মাসে বলেছেন, যুদ্ধ কোনো না কোনো সময় শেষ করতেই হবে। তাঁর মতে, শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে থাকা অবস্থায় এখনই যুদ্ধ শেষ করা হলে সেটিই ইরানের জন্য ভালো হবে।
অন্যদিকে রয়েছে কট্টরপন্থী রক্ষণশীল শিবির। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের অবিশ্বাস দীর্ঘদিনের। তাদের ধারণা, ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে দুর্বল বা ধ্বংস করা।
তাদের চোখে বর্তমান যুদ্ধই তাদের পুরোনো সতর্কবার্তার প্রমাণ। তাই তারা মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তি করা মানেই একই ভুল আবার করা।
লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিলের মতে, কট্টরপন্থীরা মনে করছে ইরান যেহেতু যুদ্ধে পুরোপুরি হারেনি, সেহেতু সেটিই তাদের কাছে এক ধরনের বিজয়। তারা শুধু ওয়াশিংটনের কাছ থেকে ভালো শর্ত আদায়ের কথা ভাবছে না; বরং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
কট্টরপন্থীদের অনেকেই প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানকে দুর্বল নেতা হিসেবে দেখছেন। তাঁর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুনের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ায় তাঁর ওপর তাদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের দায়ও তারা সরকারের ওপর চাপাচ্ছে। এমনকি কট্টরপন্থী কিছু রাজনীতিক অভিযোগ করছেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে একটি সমঝোতা মেনে নিতে চাপ দিচ্ছে।
কট্টরপন্থীদের সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো অতীতের অভিজ্ঞতা। ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে ইরানের যে পারমাণবিক চুক্তি হয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প পরে সেটি বাতিল করেন। এরপর আলোচনার মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছে—এমন ঘটনাও তারা সামনে আনছে।
তাদের বিশ্বাস, কূটনীতির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, আঞ্চলিক মিত্র ও সামরিক প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করেই ইরান এতদিন টিকে আছে।
সানাম ভাকিলের মতে, কট্টরপন্থীরা সম্ভবত ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো কার্যকর চুক্তির সম্ভাবনা খুব কম দেখছে। বরং তারা সময়ক্ষেপণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে এবং ট্রাম্পকে দুর্বল করার কৌশল নিতে পারে।
ইরানের কট্টরপন্থী আইনপ্রণেতারা আলোচনাপন্থীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা মানে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অবস্থানের বিপরীতে যাওয়া এবং ‘অপমানজনক শান্তি’ মেনে নেওয়া।
ইরানের বাস্তববাদী শিবির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করলেও ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কখনো ইরানকে শক্তিশালী করার কথা বলা, আবার পরক্ষণেই হুমকি দেওয়া—ট্রাম্পের এমন অবস্থান ইরানের কট্টরপন্থীদের যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
তাঁদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে নতুন কোনো সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত করছে। অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখা তাদের কাছে কঠিন।
এই রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাঝখানে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। যুদ্ধের পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে খুব সক্রিয় অবস্থান নেননি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আলোচনার প্রশ্নে প্রকাশ্যে কোনো একটি পক্ষকে সমর্থন করলে তাঁর নিজের অবস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে নতুন করে ক্ষমতার বৈধতা প্রতিষ্ঠার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অবস্থান নেওয়া তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
শুক্রবার তিনি চাপের মধ্যে সরকারের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করলেও দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এসব দুর্বলতা প্রকাশ্যে বেশি আলোচনা না করার সতর্কতাও দিয়েছেন, কারণ এতে শত্রুরা উৎসাহিত হতে পারে এবং মিত্রদের মনোবল কমে যেতে পারে।
কিন্তু সর্বোচ্চ নেতার কাছ থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা না আসায় কট্টরপন্থীরা তাদের প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের সমাপ্তি এখন শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনার ওপর নির্ভর করছে না; ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যও ঠিক করবে দেশটি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে, নাকি সমঝোতার পথে যাবে।
এই কারণেই ইরানের রাজনৈতিক লড়াই এখন যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হয়ে উঠেছে।

