আর্কটিক অঞ্চলের বরফে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে ছিল একটি মেরু ভালুক। চারপাশের নীরব পরিবেশে বিশ্রাম নিচ্ছিল প্রাণীটি। কিন্তু হঠাৎ একটি জাহাজের বিকট হর্ন সেই শান্ত পরিবেশ ভেঙে দেয়। শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ভালুকটির। আর এই ঘটনাকে নিছক দুষ্টুমি হিসেবে দেখেনি কর্তৃপক্ষ। এর মাশুল হিসেবে এক ব্যক্তিকে গুনতে হয়েছে ৫০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোনার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি।
ঘটনাটি ঘটেছে নরওয়ের প্রত্যন্ত স্বালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের লমফিয়োর্ডেনে, হিনলোপেনস্ট্রেট এলাকায়। চলতি আগস্ট মাসে একটি জাহাজ ওই অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় যাত্রীরা উপকূলের কাছাকাছি একটি ঘুমন্ত মেরু ভালুক দেখতে পান।
বরফের ওপর বিশ্রামরত প্রাণীটিকে দেখে জাহাজে থাকা এক ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে হর্ন বাজান। হঠাৎ বিকট শব্দে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায় ভালুকটির। পরে সেটি ওই স্থান ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যায়।
ঘটনার পর জাহাজের অন্য যাত্রীরা বিষয়টি স্বালবার্ডের গভর্নরের কার্যালয়ে জানান। এরপর শুরু হয় তদন্ত। তদন্তে কর্তৃপক্ষের কাছে স্পষ্ট হয় যে, হর্ন বাজানোর ঘটনাটি ছিল ইচ্ছাকৃত এবং এর মাধ্যমে একটি বন্যপ্রাণীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিরক্ত করা হয়েছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে স্বালবার্ড পরিবেশ আইনের ৩০(এ) ধারার প্রথম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাকে ৫০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোনার জরিমানা করা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি সেই জরিমানা মেনে নিয়ে ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছেন।
বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৫০ হাজার নরওয়েজিয়ান ক্রোনারের মূল্য প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৬ লাখ ৬০ হাজার বাংলাদেশি টাকা।
মেরু ভালুককে বিরক্ত করা কেন অপরাধ?
স্বালবার্ড অঞ্চলে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন অত্যন্ত কঠোর। সেখানে মেরু ভালুকসহ অন্যান্য প্রাণীকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিরক্ত করা, তাদের আকর্ষণ করা, ভয় দেখানো বা স্বাভাবিক আচরণে বাধা সৃষ্টি করা নিষিদ্ধ।
কারণ বন্যপ্রাণীর জীবনযাত্রা মানুষের বিনোদনের মতো নয়। বিশেষ করে মেরু ভালুকের মতো প্রাণীকে বিশ্রামের সময় বিরক্ত করলে তাদের স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। অতিরিক্ত চাপ বা ভয় তাদের শক্তি ব্যবহারের ধরন, চলাচল এবং বেঁচে থাকার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক সময় পর্যটক বা ভ্রমণকারীরা কৌতূহল থেকে এমন কিছু করেন, যা তাদের কাছে সামান্য মনে হলেও প্রকৃতির জন্য তা ক্ষতিকর হতে পারে। একটি প্রাণীকে কাছ থেকে দেখা বা তার প্রতিক্রিয়া দেখার আগ্রহ কখনোই তার স্বাভাবিক জীবনে হস্তক্ষেপ করার কারণ হতে পারে না।
স্বালবার্ড কর্তৃপক্ষের এই জরিমানা তাই শুধু একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। আর্কটিক অঞ্চলের বন্যপ্রাণী মানুষের বিনোদনের বস্তু নয়। প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মের প্রতি সম্মান দেখানোই সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি ঘুমন্ত মেরু ভালুককে জাগানোর জন্য বাজানো সেই হর্ন হয়তো কয়েক সেকেন্ডের ঘটনা ছিল। কিন্তু সেই ছোট্ট আচরণই মনে করিয়ে দিল—বন্যপ্রাণীর জগতে মানুষের কৌতূহলেরও একটি সীমা আছে। আর সেই সীমা অতিক্রম করলে প্রকৃতির আইন ও মানুষের তৈরি আইন—দুটোরই মুখোমুখি হতে হয়।

