নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা-বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু মানুষ যেন হয়ে উঠেছিলেন প্রকৃত অর্থেই ত্রাণকর্তা। তাদেরই একজন ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাদাবি, যিনি হাতে থাকা মাত্র এক মিনিট সময়ে নিয়েছিলেন এমন এক সিদ্ধান্ত, যাতে বেঁচে যায় ১ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষার্থীর জীবন।
ঘটনাটি ঘটে গত ২৬ আগস্ট বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। স্বাভাবিক নিয়মেই তখন স্কুলে চলছিল ক্লাস, স্কুলে ততক্ষণে পৌঁছে গিয়েছিল প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী, আর আরও প্রায় ৭০০ জন তখনও পথে—কেউ হেঁটে, কেউ স্কুল বাসে করে আসছিল। ঠিক তখনই স্কুল থেকে বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরের উজানের একটি গ্রাম থেকে দাদাবির এক বন্ধু ফোন করে জানান, তাদের গ্রাম বন্যার পানিতে ভেসে গেছে এবং প্রবল ঢল দ্রুত এগিয়ে আসছে। একই সময়ে স্কুল এলাকার এক অভিভাবকও এসে জানান, দ্রুত বাড়ছে পানির স্তর।
এই দুই দিক থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এক মুহূর্তও দেরি না করে দাদাবি শিক্ষকদের নির্দেশ দেন স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষ থেকে বের করে দ্রুত উঁচু জায়গায় সরিয়ে নিতে। কিন্তু বিপদ তখনও কাটেনি, কারণ আরও প্রায় ৭০০ শিক্ষার্থী তখনও কয়েকটি স্কুলবাসে করে স্কুলের দিকেই আসছিল। দাদাবি তখন দ্রুত বাসচালকদের ফোন করে স্কুলে না এসে নিরাপদ উঁচু স্থানে থামতে বলেন।
তবে একটি বাসের সঙ্গে তখনও যোগাযোগ করা যায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখতে পান, সেই বাসটি স্কুলের কাছের একটি সেতু পার হচ্ছে, অথচ চারপাশে ততক্ষণে পানি ঢুকে পড়েছে, এমনকি স্কুল মাঠেও প্রবেশ করেছে বন্যার স্রোত। দাদাবি তাৎক্ষণিকভাবে চালককে বাস ঘুরিয়ে নিতে নির্দেশ দেন, কিন্তু ততক্ষণে বাসটি সেতুর মাঝপথে পৌঁছে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাসটি নিরাপদে অপর পাড়ে পৌঁছায়, আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সেতুটি সম্পূর্ণভাবে ধসে পড়ে।
এদিকে স্কুল ভবনের ভেতরেও ততক্ষণে পানি ঢুকে গিয়েছিল। প্রবল স্রোতে একের পর এক ভবন ভেসে যেতে শুরু করে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই দাদাবি ও অন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছুটে যান কাছের পাহাড়ের দিকে, শিশুরা হেঁটে হেঁটে পৌঁছায় নিরাপদ উঁচু জায়গায়।
তাদের পেছনে তখন আর অবশিষ্ট নেই কোনো স্কুল ভবন, নেই শ্রেণিকক্ষ কিংবা মাঠ—তবে টিকে গেছে ১ হাজার ৬৪৩টি তাজা প্রাণ।
চলচ্চিত্রের কাহিনিকেও হার মানানো এই লোমহর্ষক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে, যেখানে তুলে ধরা হয়েছে এই শিক্ষকের অসামান্য সাহসিকতার কথা। যদিও ৪৭ বছর বয়সী রাজেন্দ্র দাদাবি নিজে মনে করেন, সেই মুহূর্তে তিনি যা করেছেন, তা যে কারো পক্ষেই করা সম্ভব ছিল—তার ভাষায় এটি ছিল নিতান্তই সাধারণ একটি দায়িত্ব পালন মাত্র।

