রাশিয়ার নতুন প্রজন্মের দ্রুতগতির ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ধরনের ইন্টারসেপ্টর বা আকাশ প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরির চেষ্টা করছে ইউক্রেন। গত কয়েক মাসে এসব অস্ত্র দেশটির রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।
রাশিয়া এখন শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বরং গুদাম, গ্যাস স্টেশন, ডাকঘর, কারখানা, খাদ্য সংরক্ষণাগার এবং জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালাচ্ছে। ফলে যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুর পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জেটচালিত নতুন শাহেদ ড্রোন। রাশিয়ায় এগুলো গেরান-৪ ও গেরান-৫ নামে পরিচিত। ইরান থেকে পাওয়া পুরোনো শাহেদ ড্রোনগুলোর তুলনায় নতুন সংস্করণগুলো প্রায় তিনগুণ দ্রুতগতির। একই সঙ্গে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যায় এসব ড্রোন ব্যবহার করায় সেগুলো প্রতিহত করা ইউক্রেনের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, দেশটির ওপর প্রায় বিরতিহীনভাবে ড্রোন হামলা চলছে এবং এর বড় একটি অংশ জেটচালিত শাহেদ ড্রোন।
তিনি বলেন, মাত্র চার দিনে রাশিয়া ইউক্রেনের দিকে প্রায় ১,৫০০ ড্রোন ছুড়েছে। এর অর্ধেকেরও বেশি ছিল জেটচালিত।
জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্টনভের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে প্রায় ১,৫০০ জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। আগস্টে এই সংখ্যা বেড়ে ২,৫০০ ছাড়িয়েছে।
তার ভাষায়, এসব ড্রোন যেন কারখানা থেকে বের হওয়ার পরপরই সরাসরি ইউক্রেনের দিকে পাঠানো হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, এসব ড্রোনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীনসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের তৈরি শত শত যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে।
কিয়েভে দিন-রাত অব্যাহত হামলা
নতুন জেটচালিত ড্রোনগুলোর বড় একটি অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে কিয়েভকে লক্ষ্য করে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া দিন ও রাত উভয় সময়েই রাজধানীর ওপর হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে।
শনিবার ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানায়, দিনের আলোতেই রাশিয়া ২২৪টি ড্রোন ছুড়েছিল, যার অধিকাংশই ছিল জেটচালিত। পরদিন কিয়েভে মধ্যরাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আটবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বেজে ওঠে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়ার উদ্দেশ্য শুধু অবকাঠামো ধ্বংস করা নয়। তাদের লক্ষ্য ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্রমাগত ব্যস্ত ও দুর্বল করে তোলা এবং সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দেওয়া।
খাদ্যগুদাম, দোকান এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে।
ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সেরহি কোরেতস্কি বলেন, রাশিয়া কিয়েভ ও অন্যান্য বড় শহরের অর্থনৈতিক কার্যক্রম অচল করে দিতে চাইছে। ফলে ইউক্রেনকেও নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশল ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হবে।
নতুন শিক্ষাবর্ষেও যুদ্ধের ছায়া
রাশিয়ার দিনের বেলার হামলা এমন এক সময়ে বেড়েছে, যখন ইউক্রেনের শিশুরা নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতি নিচ্ছে।কিয়েভ নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমান হামলার সতর্কতার কারণে স্কুলের পাঠদান বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিভাবকদের বলা হয়েছে, সন্তানদের সঙ্গে আগে থেকেই আলোচনা করতে হবে, বিমান হামলার সতর্কতা বাজলে তারা কী করবে, কোথায় আশ্রয় নেবে এবং স্কুলে যাওয়া বা ফেরার পথে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়লে কীভাবে নিরাপদ থাকবে।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, বর্তমান বাস্তবতায় এসব বিষয়ও এখন স্কুলব্যাগ গোছানো বা স্কুলের পোশাক প্রস্তুত করার মতোই নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতির অংশ।
প্রযুক্তির পাল্টাপাল্টি লড়াই
জেলেনস্কি স্বীকার করেছেন, বর্তমানে দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন মোকাবিলায় ইউক্রেনকে মূলত যুদ্ধবিমান ব্যবহার করতে হচ্ছে।
কিন্তু ইউক্রেনের বিমানবহর তুলনামূলকভাবে ছোট এবং যুদ্ধের বিভিন্ন ফ্রন্টে আগে থেকেই ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। তার ওপর সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করাও দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নয়।
এই কারণে এখন নতুন ইন্টারসেপ্টর ড্রোন তৈরির দিকে জোর দিচ্ছে ইউক্রেন।
জেলেনস্কির তথ্য অনুযায়ী, চারটি ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে দ্রুতগতির ড্রোন ঠেকানোর উপযোগী ইন্টারসেপ্টর তৈরি করেছে। এর মধ্যে একটি প্রযুক্তি অন্যগুলোর তুলনায় বেশি সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে।প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়েভগেনি খমারা জানিয়েছেন, চারটি প্রযুক্তিই মাঠপর্যায়ে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তার মতে, লক্ষ্য হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব এসব প্রযুক্তিকে প্রয়োজনীয় মানে উন্নীত করা এবং উৎপাদন বাড়িয়ে মাসে হাজার হাজার ইন্টারসেপ্টর তৈরি করা।
তবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন আর সেটি ব্যাপকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট দপ্তরের উপপ্রধান পাভলো পালিসা বলেন, আক্রমণাত্মক প্রযুক্তি সাধারণত প্রতিরক্ষামূলক প্রযুক্তির চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকে। ফলে প্রতিবারই নতুন হুমকির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয় এবং এতে সময় লাগে।
আশার আলো দেখাচ্ছে ‘স্টিং’
ইউক্রেনের নিজস্বভাবে তৈরি স্টিং নামের একটি ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ইতিমধ্যে সম্ভাবনাময় ফল দেখিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে স্টিং ব্যবহার করে দুটি জেটচালিত রুশ ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
আরেক ইউক্রেনীয় প্রতিষ্ঠান এফ-ড্রোনস তাদের ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি আরও উন্নত করেছে। নতুন সংস্করণের নাম দেওয়া হয়েছে LITAVR+।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নতুন ইন্টারসেপ্টর ঘণ্টায় ৪০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে উড়তে পারে।রাশিয়ার জেটচালিত শাহেদ ড্রোনের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরক্ষা গড়ে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সন্ধান
নতুন প্রযুক্তি তৈরির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়াতে চাইছে ইউক্রেন।
দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ যুক্তরাষ্ট্র সফর শুরু করেছেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি কোম্পানি ও সম্ভাব্য অংশীদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ খুঁজছেন।
তার লক্ষ্য হচ্ছে এমন সব নতুন প্রকল্প গড়ে তোলা, যেগুলো বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব।
বিশেষভাবে তিনি এমন রোবোটিক প্রযুক্তি তৈরির কথা বলেছেন, যার মাধ্যমে সবচেয়ে বিপজ্জনক সম্মুখসারির এলাকায় মানুষের উপস্থিতি কমানো যাবে।একই সঙ্গে তুলনামূলক কম খরচে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইনির্ভর ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিও পরিকল্পনার অংশ।
ইউক্রেনের সমুদ্রপথে নতুন হুমকি ‘ব্যান্ডেরল’
ড্রোনের পাশাপাশি রাশিয়া নতুন ধরনের তুলনামূলক সস্তা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করছে। এর নাম ব্যান্ডেরল।
প্রায় পাঁচ মিটার বা ১৬ ফুট দীর্ঘ এই ক্ষেপণাস্ত্র ঘণ্টায় প্রায় ৬২০ থেকে ৬৫০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে।এর পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার এবং এতে প্রায় ১৫০ কিলোগ্রাম ওজনের বিস্ফোরক ওয়ারহেড বহন করা সম্ভব।
ক্রিমিয়ার আকাশ থেকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ছোড়া হলে এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের বড় একটি অংশে হামলা চালানো যায়।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওডেসা বন্দর লক্ষ্য করে কয়েক ডজন ব্যান্ডেরল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শস্য রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শস্য রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
ইউক্রেনের কৃষিনীতি বিষয়ক মন্ত্রী তারাস ভিসোৎস্কির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরু থেকে দেশটি প্রায় ১৪ লাখ টন শস্য ও তেলবীজ রপ্তানি করেছে।কিন্তু এই পরিমাণ দেশটির সম্ভাব্য রপ্তানি সক্ষমতার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
ইউক্রেনের নৌবাহিনীর মুখপাত্র দমিত্রো প্লেতেনচুক জানিয়েছেন, ব্যান্ডেরল হামলার কারণে কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের সামুদ্রিক করিডরের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে গেছে।
শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অব্যাহত হামলার কারণে শস্যবাহী জাহাজের বীমার খরচও এত বেশি বেড়ে যাচ্ছে যে রপ্তানি কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ভবিষ্যতে রাশিয়া ব্যান্ডেরল ক্ষেপণাস্ত্র শুধু হেলিকপ্টার বা ড্রোন থেকে নয়, ভূমিভিত্তিক লঞ্চার থেকেও ছোড়ার ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
‘জবাব দিতে না পারলে তারা আমাদের গুঁড়িয়ে দেবে’
মিখাইলো ফেদোরভকে জুলাই মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন জেলেনস্কি। বর্তমানে তিনি বেসরকারি পর্যায়ে কাজ করছেন।তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেন ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে।
ওয়াশিংটন সফরের সময় ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফেদোরভ বলেন, যুদ্ধের পরিস্থিতি প্রায় প্রতি মাসেই বদলে যাচ্ছে। তবে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান বিমান হামলা, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র এবং নতুন প্রজন্মের ড্রোনের ব্যবহার এখন ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুতর চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।তার সতর্কবার্তা ছিল স্পষ্ট।
এই নতুন হুমকিগুলোর দ্রুত ও কার্যকর জবাব দিতে না পারলে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার আক্রমণের চাপ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
যুদ্ধ এখন আর শুধু সেনা, ট্যাংক বা প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের লড়াই নয়। এটি ক্রমেই প্রযুক্তি, গতি, উৎপাদনক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের নতুন অস্ত্রের বিরুদ্ধে কত দ্রুত পাল্টা ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, সেই প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে।
আর এই প্রযুক্তিগত দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার মূল্য ইউক্রেনকে দিতে হচ্ছে শহর, অর্থনীতি, রপ্তানি অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে।

