নেপালে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া ছয় শতাধিক শ্রমিককে জীবিত উদ্ধারের আশা এখনো ছাড়েননি তাদের পরিবার-পরিজন ও উদ্ধারকর্মীরা। সোমবার পাহাড়ের একাংশ বিস্ফোরণের মাধ্যমে সরিয়ে ত্রিশূলী ৩-এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তবে উদ্ধারকারীরা মনে করছেন, জীবিতদের বাঁচানোর মতো সময় ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সৃষ্ট এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩৯ জনে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ, যাদের মধ্যে প্রায় ছয় শতাধিক বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন। উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে নেপাল ও চীনের সামরিক বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক দল, যাতে যুক্ত হয়েছেন ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরাও। নেপালের সরকারপ্রধান জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিনশর কাছাকাছি মানুষকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
তবে আটকে পড়াদের পরিবারের কাছে এই সময়টা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এক নিখোঁজ প্রকৌশলীর স্ত্রী গণমাধ্যমকে জানান, তিনি শুধু চান তার স্বামী খুঁজে পাওয়া যাক ও বাড়ি ফিরে আসুক। আরেকজন শ্রমিকের স্ত্রী কিছুটা আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকায় তিনি এখনো আশা রাখছেন তার স্বামী বেঁচে আছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনে জলবিদ্যুতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল নেপালে এই দুর্যোগে অন্তত এগারোটি নির্মাণাধীন ও সম্পন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সোমবার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রমুখী সুড়ঙ্গে প্রবেশ করতে সক্ষম হলেও সেখানে কাউকে না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসে উদ্ধারকারী দল, যা গোটা অভিযানকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উদ্ধার অভিযানের ধীরগতি নিয়ে স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভও বাড়ছে। নিখোঁজ এক শ্রমিকের এক আত্মীয় জানান, সময় যত গড়াচ্ছে, আশাও তত কমে আসছে এবং অভিযান আরও দ্রুততর করা প্রয়োজন—কারণ প্রতিটি মুহূর্ত এখানে মূল্যবান। দেশটির সরকারপ্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করার সময় এসেছে। অন্য একটি প্রকল্পে কর্মরত এক প্রকৌশলীর বোনও ভাইয়ের খবরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তার ভাষ্যমতে, প্রকল্প থেকে ফিরে আসা মানুষজন সুড়ঙ্গের ভেতরে এখনো লোক আটকে থাকার কথা জানিয়েছেন এবং সেনাবাহিনী দ্রুত সেখানে পৌঁছাতে পারলে তাদের জীবিত উদ্ধার সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
উদ্ধার অভিযানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সুড়ঙ্গগুলোর সঠিক অবস্থান শনাক্ত করা। দূর থেকে নেপালের কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিচ্ছেন এক অভিজ্ঞ প্রকৌশলী, যিনি জানিয়েছেন, বন্যার তীব্রতায় সুড়ঙ্গগুলোর অস্তিত্বের প্রায় সব চিহ্নই মুছে গেছে এবং পুরো এলাকাটি দেখতে অনেকটা চাঁদের পৃষ্ঠের মতো হয়ে পড়েছে। তার মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঠিক অবস্থান নিশ্চিত হতে পারলেই সেখানে পৌঁছানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ বের করা সম্ভব হবে। এ ধরনের অভিযানে সাধারণত খনন এবং বিশালাকার পাথর বিস্ফোরণের মাধ্যমে সরানোর প্রয়োজন হয়—কিছু পাথর এত বড় যে তা একটি বাড়ির সমান, এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখা যায়নি বলে জানান তিনি। তবে তার বিশ্লেষণ, ভূগর্ভস্থ পরিবেশ ওপরের ভয়াবহ জলস্রোত থেকে আটকে পড়াদের কিছুটা সুরক্ষা দিয়ে থাকতে পারে, যা এখনো জীবিত উদ্ধারের আশাকে টিকিয়ে রেখেছে।
এদিকে উদ্ধার হওয়া প্রায় নয়শ মরদেহের মধ্যে মাত্র সামান্য অংশের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বন্যার মূল কেন্দ্র থেকে বহু দূরে ভাটিতে অবস্থিত একটি জেলায় নদীর স্রোতে ভেসে অন্তত তিনশর কাছাকাছি মরদেহ পৌঁছেছে, যেগুলো পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে দাফন করা হচ্ছে। সুরক্ষা সরঞ্জাম পরিহিত কর্মীরা পচনশীল মরদেহ সংগ্রহ করে ট্রাকে তুলছেন, আর শহরতলির একটি বনভূমিতে মাটি খুঁড়ে চলছে অস্থায়ী দাফনের কাজ। পরিচয় নিশ্চিতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করছেন চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা। সংশ্লিষ্ট এক জেলা প্রশাসক জানান, ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় মিললে পরিবার তাদের প্রিয়জনের মরদেহ ফেরত পাবে, তবে পর্যাপ্ত হিমাগার সুবিধা না থাকায় অস্থায়ী দাফনই তাদের কাছে একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং পরিস্থিতি সামলাতে তারা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
সীমান্তের ওপারে তিব্বতেও একই বন্যায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকশ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে সেখানকার প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য ও দৃশ্য প্রকাশে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি—এমন মন্তব্য করায় বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। একই সঙ্গে নেপালেও বন্যা সংক্রান্ত কথিত ভুল তথ্যযুক্ত অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যা দুর্যোগ-পরবর্তী তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সব মিলিয়ে হিমালয়ের কোলে ঘটে যাওয়া এই দুর্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির ঘটনা নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পাহাড়ি অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিরও একটি নির্মম প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই বাড়ছে স্বজনদের উৎকণ্ঠা, আর প্রশ্ন উঠছে—ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের অবকাঠামো ও দুর্যোগ প্রস্তুতি কতটা যথেষ্ট।

