দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সিরিয়ার নাম উচ্চারিত হলেই সামনে ভেসে উঠেছে যুদ্ধ, ধ্বংস, শরণার্থী, নিষেধাজ্ঞা, জঙ্গিবাদ এবং বিদেশি শক্তির সংঘাতের ছবি। অথচ ইতিহাসের বড় একটি সময় সিরিয়ার পরিচয় ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশটি ছিল ইরাক, জর্ডান, লেবানন, তুরস্ক এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একটি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক সেতু। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইউরোপের দিকে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রেও সিরিয়ার অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গৃহযুদ্ধ সেই ভূগোলকে অকার্যকর করে দিয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের নতুন অস্থিরতা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট, আবারও সেই পুরোনো ভূগোলকে মূল্যবান করে তুলছে। কয়েক বছর আগেও যে সিরিয়াকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য প্রায় অচল ভূখণ্ড মনে করা হতো, এখন সেই দেশকেই অনেক রাষ্ট্র সম্ভাব্য বিকল্প পরিবহনপথ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রতীকী দৃশ্যটি দেখা যায় এপ্রিলের শুরুতে। ২৯৯টি ইরাকি জ্বালানি ট্যাংকারের একটি বহর সিরিয়ায় প্রবেশ করে ভূমধ্যসাগরের বানিয়াস বন্দরের দিকে যাত্রা করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর জন্য ইরাকের হাতে যে অল্প কয়েকটি বিকল্প পথ ছিল, সিরিয়া হয়ে বানিয়াসে যাওয়া সেই পথগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
ঘটনাটি শুধু কয়েকশ জ্বালানি ট্যাংকারের সীমান্ত অতিক্রম নয়। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও গভীর। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের পর প্রথমবারের মতো বৈধভাবে ইরাকি তেল সিরিয়া অতিক্রম করে। সেই যুদ্ধের পর ইরাক থেকে সিরিয়ায় তেল পরিবহনের স্বাভাবিক প্রবাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
এপ্রিলের শেষ দিকে এই যোগাযোগ আরও বিস্তৃত হয়। ইরাক সিরিয়ার সঙ্গে উত্তরের রাবিয়া সীমান্তপথ আবার খুলে দেয়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পথ বন্ধ ছিল। এর পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাণিজ্যের পরিমাণ কত দ্রুত বেড়েছে, সেটি একটি সংখ্যা থেকেই বোঝা যায়। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত ২.১ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি ইরাকি জ্বালানি সিরিয়ার উপকূলে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের মানচিত্রে এমন একটি পরিবর্তন শুরু হয়েছে, যার কেন্দ্রে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে সিরিয়া।
২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির অবস্থান ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক বাণিজ্যকেন্দ্রের মতো। ইরাক থেকে ভূমধ্যসাগর, তুরস্ক থেকে আরব অঞ্চল কিংবা উপসাগর থেকে ইউরোপ—বিভিন্ন দিকের যোগাযোগের মাঝখানে ছিল সিরিয়া। কিন্তু যুদ্ধের পর সেই স্বাভাবিক বাণিজ্য কাঠামো ভেঙে পড়ে।
এর জায়গায় তৈরি হয় অন্য ধরনের পথ। ইরান সিরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করে লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা পৌঁছে দিত। একই সময়ে জ্বালানি, মাদক এবং বিভিন্ন অবৈধ পণ্যের বাণিজ্যও বাড়তে থাকে। এসব কর্মকাণ্ড বাশার আল-আসাদ সরকারের ক্ষমতার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করলেও সাধারণ সিরীয় নাগরিকের জীবনে তার বড় কোনো অর্থনৈতিক সুফল পৌঁছায়নি।
পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলাতে শুরু করে ২০২৪ সালের শেষ দিকে। হায়াত তাহরির আল-শামের হাতে আসাদ সরকারের পতনের পর আঞ্চলিক বাণিজ্য ধীরে ধীরে আবার সিরিয়ার দিকে ফিরতে শুরু করে। বর্তমানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা একসময় এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন।
পরিবর্তনটির মাত্রা বোঝা যায় আগস্ট ২০২৫-এর তথ্য থেকে। সিরিয়ার শুল্ক কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ের মধ্যে প্রায় ৩২৭,০০০ ট্রাক ৭ মিলিয়ন টনের বেশি পণ্য নিয়ে সিরিয়ায় প্রবেশ করেছিল। জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ক নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সিরিয়ায় ব্যবসা ও বিনিয়োগেও আগ্রহ দেখাতে শুরু করে।
নতুন সরকারের সামনে তখন একটি বড় লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে সিরিয়াকে বের করে আবার আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা।
কিন্তু সমস্যাও বিশাল।
এক দশকের বেশি সময়ের যুদ্ধ শুধু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো নয়, রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, বাড়িঘর, শিল্পকারখানা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত ধ্বংস করেছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংক হিসাব করেছিল, সিরিয়া পুনর্গঠনে প্রায় 216 বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এই পরিমাণ ২০২৪ সালের জন্য অনুমান করা সিরিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় দশ গুণ।
তাই কয়েক লাখ ট্রাক চলাচল শুরু করা কিংবা কয়েকটি নতুন বিনিয়োগ চুক্তি সিরিয়ার সমস্যার পূর্ণ সমাধান নয়। দেশটির জন্য প্রয়োজন এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামো, যা বিদেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ থেকে আয় করে সেই অর্থ দেশের ভেতরের পুনর্গঠনে ব্যবহার করতে পারবে।
এই জায়গায় হরমুজ প্রণালির সংকট সিরিয়ার সামনে অপ্রত্যাশিত একটি সুযোগ খুলে দিয়েছে।
হরমুজ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে, এই পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি আবারও সামনে এসেছে। উপসাগরীয় দেশ কিংবা ইরাকের মতো তেল উৎপাদক রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রশ্ন উঠেছে—হরমুজ অচল হয়ে গেলে তেল আন্তর্জাতিক বাজারে যাবে কোন পথে?
ভূগোলের কারণে সিরিয়া এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তরগুলোর একটি।
ইরাকের তেল সিরিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে পারে। সেখান থেকে ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে যাওয়ার পথ খোলা। একইভাবে রেলপথ, সড়কপথ এবং ভবিষ্যৎ পাইপলাইন ব্যবহার করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকেও সিরিয়া হয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব।
ফলে দামেস্ক এখন নিজের পুরোনো পরিচয় বদলে দিতে চাইছে। যুদ্ধ ও শরণার্থীর দেশ থেকে সিরিয়া নিজেকে এমন একটি রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে চায়, যার ভূখণ্ড ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাণিজ্যব্যবস্থার একটি বড় অংশ কল্পনা করা কঠিন হবে।
এরই অংশ হিসেবে আবার আলোচনায় এসেছে ঐতিহাসিক হিজাজ রেলপথ।
এই রেলপথের পুনর্গঠনের ধারণা একেবারে নতুন নয়। ২০০৯ সালে সৌদি আরব ও তুরস্ক এটি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছিল। উসমানীয় আমলে নির্মিত রেলপথটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই পরিকল্পনা আর এগোয়নি।
যুদ্ধ সিরিয়ার বাণিজ্যকে কতটা ধ্বংস করেছিল, তার একটি বড় উদাহরণ রপ্তানি খাত। ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সিরিয়ার রপ্তানি প্রায় 90 শতাংশ কমে যায়। দেশের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় একসময় প্রধান বাণিজ্যপথগুলোর অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে পড়ে।
এর মধ্যে ২০২৩ সালে ভারত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় অংশীদারেরা ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দেয়। পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বাড়ানো এবং ইউরোপের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যপথ তৈরি করা। ওই পরিকল্পনায় ইসরায়েলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
কিন্তু হরমুজে অস্থিরতা বাড়ায় সিরিয়াকে ঘিরে পুরোনো রেলপথের গুরুত্ব আবার বেড়েছে।
এই বছরের এপ্রিল ও জুনে জর্ডান, সৌদি আরব, সিরিয়া ও তুরস্ক তিন থেকে চার বছরের মধ্যে হিজাজ রেলপথ পুনর্গঠনের বিষয়ে সম্মত হয়। তুলনামূলক আঞ্চলিক রেলপথ নিয়ে করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শুরুতে এই রেলপথ দিয়ে বছরে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন কনটেইনার পরিবহন করা সম্ভব হতে পারে। পরবর্তী সময়ে রেলপথ ও বন্দর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে সেটি ৩ মিলিয়ন কনটেইনারে পৌঁছাতে পারে।
এই প্রকল্প সফল হলে সিরিয়ার গুরুত্ব শুধু তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেই বাড়বে না। সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে পণ্য পরিবহনেও দেশটি বড় ভূমিকা নিতে পারবে।
আহমেদ আল-শারা আরও বড় একটি পরিকল্পনার কথাও বলেছেন। এপ্রিলে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের একটি অনানুষ্ঠানিক সম্মেলনে তিনি এমন একটি যোগাযোগব্যবস্থার ধারণা তুলে ধরেন, যেখানে সিরিয়াকে কেন্দ্র করে পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর এবং ভূমধ্যসাগর পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য, বিদ্যুৎ এবং তেল পরিবহনের একাধিক পথ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
শুনতে উচ্চাভিলাষী হলেও সিরিয়ার ভূগোল এই ধারণাকে পুরোপুরি অবাস্তব হতে দেয় না।
বরং বড় প্রশ্ন হলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি রাষ্ট্র এত বিশাল অবকাঠামো পরিচালনার মতো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা তৈরি করতে পারবে কি না।
সিরিয়ার নতুন অর্থনৈতিক ভূমিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর একটি হতে পারে কিরকুক-বানিয়াস তেল পাইপলাইন।
জুলাইয়ে ইরাক ও সিরিয়া এই পাইপলাইন পুনর্গঠনের বিষয়ে সম্মত হয়েছে। এটি ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের সময় ধ্বংস হয়েছিল।
পাইপলাইনটি আবার চালু হলে ইরাকের জন্য ভূমধ্যসাগরে পৌঁছানোর একটি স্থায়ী তেলপথ তৈরি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী চার বছরের মধ্যে কাজ শেষ করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিদিন 2 মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব হতে পারে।
এই পরিমাণ ইরান যুদ্ধের আগে ইরাকের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ। একই সঙ্গে এটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত মোট তেলের আনুমানিক ৯ শতাংশের সমান।
তুরস্কের মধ্য দিয়ে পরিকল্পিত অন্যান্য পথও কার্যকর হলে ইরাক ভবিষ্যতে তার মোট রপ্তানির 80 শতাংশের বেশি হরমুজ এড়িয়ে অন্য পথে পাঠাতে সক্ষম হতে পারে।
এই পরিবর্তন বাস্তবে ঘটলে শুধু ইরাক কিংবা সিরিয়ার অর্থনীতি নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যই বদলে যেতে পারে।
কারণ হরমুজের ওপর নির্ভরতা যত কমবে, বিকল্প স্থল ও সমুদ্রপথের গুরুত্ব তত বাড়বে। আর সেই নতুন মানচিত্রে সিরিয়া এমন একটি ভূখণ্ড, যাকে উপেক্ষা করা কঠিন।
তবে এখানেই সিরিয়ার সবচেয়ে বড় বিপদও লুকিয়ে আছে।
যে ভূগোল দেশটিকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি দিতে পারে, একই ভূগোল তাকে বিদেশি শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে।
সৌদি আরব ও তুরস্ক আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থায় পরস্পরের কাছাকাছি আসছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বন্দর ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চাইছে। অন্যদিকে ইসরায়েল তার সীমান্তের কাছাকাছি তুরস্কের প্রভাব বাড়াকে সন্দেহের চোখে দেখছে।
ফলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু কে কত টাকা বিনিয়োগ করবে, তা নিয়ে হবে না। প্রশ্ন উঠবে—কে রেলপথ নির্মাণ করবে, কে বন্দর পরিচালনা করবে, কে পাইপলাইনের নিরাপত্তা দেবে, আর কে এসব পথের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করবে।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখনও পুরোপুরি শক্তিশালী নয়। এ অবস্থায় বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা দ্রুত বেড়ে গেলে দেশটি যুদ্ধের পর স্বাধীন অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিবর্তে নতুন ধরনের বিদেশি নির্ভরতায় আটকে যেতে পারে।
দামেস্ক এই ঝুঁকি কমাতে যত বেশি সম্ভব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছে। কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক সহায়তার বাস্তবতা সিরিয়াকে ধীরে ধীরে কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ককেন্দ্রিক একটি বলয়ের দিকে টেনে নিতে পারে।
এই পুরো পরিবর্তনকে ইসরায়েলও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
হিজাজ রেলপথ পুনর্গঠিত হলে আরব দেশগুলোর ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাতে ইসরায়েলের ওপর নির্ভরতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডরের ক্ষেত্রেও ইসরায়েলের বর্তমান গুরুত্ব কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সিরিয়ার সঙ্গে কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। জুনে ইসরায়েলের পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ এমন আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি অংশীদারত্ব, যা ইসরায়েলকে এড়িয়ে যায়, সেগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রকৃত কৌশলগত হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।
ইসরায়েলের উদ্বেগ শুধু বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
২০২৫ সালে দেশটি দোহায় হামাসের একটি স্থাপনায় হামলা চালায় এবং সিরিয়ার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সামরিক আঘাত হানে। এর মধ্যে এমন কয়েকটি বিমানঘাঁটিও ছিল, যেগুলো তুরস্কের সামরিক দল সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য পর্যালোচনা করছিল।
এরপর আগস্ট ২০২৬-এ ইসরায়েল সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ অভিযোগ করেছিলেন, সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির সুযোগ তৈরির প্রস্তুতি চলছিল।
সিরিয়া এখন পর্যন্ত সরাসরি সামরিক প্রতিশোধে না গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনার পথ অনুসরণ করেছে। এর কারণও বাস্তবসম্মত। দীর্ঘ যুদ্ধের পর দেশটির সামনে পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় কাজ। এই অবস্থায় ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন পূর্ণাঙ্গ সংঘাত সিরিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
কিন্তু বিদেশি সামরিক চাপই একমাত্র সমস্যা নয়। বিদেশি বিনিয়োগও ভবিষ্যতে সিরিয়ার জন্য সুযোগ ও ঝুঁকি—দুই-ই তৈরি করতে পারে।
বাশার আল-আসাদের আমলে রাজনৈতিক সমর্থনের বিনিময়ে বিদেশি শক্তিকে সিরিয়ার সম্পদ ও ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার নজির ছিল। রাশিয়া সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি ফসফেট, তেল, গ্যাস ও বন্দরসংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছিল। ইরান সিরিয়াকে লেবাননের দিকে যাওয়ার স্থলপথ হিসেবে ব্যবহার করেছিল এবং দেশটিতে হাজার হাজার সেনাও মোতায়েন করেছিল।
শারার সরকার এই ব্যবস্থার কিছু অংশ ভেঙে দিয়েছে। ইরানি ও হিজবুল্লাহ বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইরানের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থার অনেক অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং আগে রুশ নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি সামরিক ঘাঁটির ওপর সিরিয়ার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যদিও কিছু ঘাঁটি যৌথভাবে পরিচালিত হবে।
তবে সামরিক নির্ভরতা কমলেও অর্থনৈতিক নির্ভরতার নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে।
পুনর্গঠনের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন হওয়ায় নতুন সরকার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করেছে। গত জুনে শারা একটি আদেশে অধিকাংশ খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পূর্ণ মালিকানার অধিকার দেন। একই সঙ্গে মুনাফা দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এবং বিস্তৃত কর ও শুল্ক সুবিধাও দেওয়া হয়।
এর ফলে বিনিয়োগ আসা সহজ হতে পারে। কিন্তু বড় ঝুঁকি হলো, বিনিয়োগের অনুমতি, সরকারি জমি এবং করসুবিধা দেওয়ার ক্ষমতা মূলত প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
স্বাধীন তদারকি না থাকলে এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার পুরোনো সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনতে পারে। সিরিয়ার মতো একটি দেশে বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল, কারণ সম্পদ বণ্টনে বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার অতীতেও সামাজিক ক্ষোভ তৈরির বড় কারণ ছিল।
বন্দর পরিচালনার চুক্তিগুলোও একই প্রশ্ন তুলছে।
ফরাসি মালিকানাধীন জাহাজ পরিবহন প্রতিষ্ঠান সিএমএ সিজিএম সিরিয়ার সবচেয়ে বড় লাতাকিয়া বন্দর পরিচালনার জন্য 30 বছরের অনুমতি পেয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বন্দরের আয়ের ৬০ শতাংশ সিরিয়া সরকার পাবে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দরে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও অর্থায়ন করবে। বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি 30 বছর বন্দর পরিচালনা করবে, এরপর নিয়ন্ত্রণ আবার দামেস্কের হাতে ফিরবে।
কিন্তু এই চুক্তিতে রাজস্ব ভাগাভাগির পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ না হওয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে—সিরিয়া শেষ পর্যন্ত কত অর্থ পাবে এবং সেই অর্থ দেশের কোন অংশে ব্যয় হবে?
সিরিয়ার পুনর্গঠনের বিশাল খরচের কারণে বিদেশি অর্থ প্রত্যাখ্যান করা প্রায় অসম্ভব।
বিশ্বব্যাংক বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্য এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত জনসেবা প্রকল্পে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে। কিন্তু এই অর্থ সিরিয়ার মোট পুনর্গঠন প্রয়োজনের ১ শতাংশেরও কম।
অন্যদিকে অক্টোবরে শারা জানিয়েছিলেন, সরকারের প্রথম দশ মাসে তুরস্ক ও উপসাগরীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি এসেছে। এটি দেশটির মোট আনুমানিক পুনর্গঠন ব্যয়ের প্রায় ১৩শতাংশ।
তবে এই অর্থের বড় অংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, বিমানবন্দর, টেলিযোগাযোগ এবং শহরের বড় আবাসন ও সম্পত্তি উন্নয়ন প্রকল্পে যাওয়ার কথা। যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাড়িঘর, স্থানীয় সেবা এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন পুনর্গঠনে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২৪ বিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থ এখনও নিশ্চিত বিনিয়োগ নয়। এর একটি বড় অংশ প্রাথমিক সমঝোতা ও প্রতিশ্রুতির পর্যায়ে রয়েছে।
পুনর্গঠনের অর্থ পরিচালনার জন্য শারা সরকার দুটি বিশেষ তহবিলও তৈরি করেছে। একটি মূলত অনুদান ও সাহায্যের অর্থ ব্যবহার করে রাস্তা, সেতু, পানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থা পুনর্গঠন করবে। অন্যটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ পরিচালনা, সরকারি সম্পত্তিতে বিনিয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অংশ নেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে।
কাগজে এই ব্যবস্থা কার্যকর মনে হলেও উদ্বেগের জায়গা রয়েছে। কারণ দ্বিতীয় তহবিলটির পরিচালনা সরাসরি প্রেসিডেন্টের অধীনে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত এবং স্বাধীন তদারকি ও জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা এখনও সীমিত।
যে দেশে ১৯৬০-এর দশক থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, সেখানে এই ধরনের কেন্দ্রীকরণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।
সিরিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের আরেকটি বড় বিষয় হলো দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য।
শুধু দামেস্ক সমৃদ্ধ হলে এবং বন্দর, পাইপলাইন ও রেলপথ থেকে বিপুল আয় এলেই সিরিয়ার পুনর্গঠন সফল হবে না। রাজধানী ও বড় শহর উন্নত হলেও দূরবর্তী প্রদেশগুলো যদি বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং অবকাঠামোর অভাবে পড়ে থাকে, তাহলে পুরোনো বৈষম্য নতুন করে ফিরে আসবে।
গত দুই বছরে আলাওয়ি-অধ্যুষিত উপকূল, দ্রুজ-অধ্যুষিত সুয়েইদা এবং কুর্দি-নেতৃত্বাধীন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সংঘর্ষ কেন্দ্রীয় সরকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল সিরীয় গণতান্ত্রিক বাহিনীর সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্ক।
কেন্দ্রীয় সরকার ও এই বাহিনী মার্চ ২০২৫-এ একীভূত হওয়ার একটি চুক্তি করেছিল। কিন্তু সামরিক কাঠামোয় একীভূত হওয়া এবং কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে মতবিরোধের কারণে প্রথম দিকে সেই চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি।
পরবর্তী জানুয়ারিতে সংঘর্ষ শুরু হলে ১৭০,০০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর নতুন সমঝোতায় সীমান্তপথ, তেল ও গ্যাসক্ষেত্র এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দামেস্কের কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়। একই সঙ্গে ওই বাহিনীর যোদ্ধাদের সিরিয়ার সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়।
কয়েক মাস ধরে ধাপে ধাপে এই সমঝোতা বাস্তবায়নের পর আগস্টে বাহিনীটির কমান্ডার মাজলুম আবদি স্বাধীন সামরিক শক্তি হিসেবে তাদের বিলুপ্তি এবং উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন স্বশাসনের অবসান ঘোষণা করেন।
দামেস্কের জন্য এটি বড় সাফল্য হলেও সমস্যার পুরো সমাধান নয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুর্দি জনগোষ্ঠী যদি মনে করে নতুন ব্যবস্থায় তাদের অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কিংবা স্থানীয় স্বার্থ যথেষ্ট সুরক্ষিত হয়নি, তাহলে নতুন অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। আর সেই অসন্তোষ দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নতুন বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
একই সময়ে দেশে ফিরছেন বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ।
মে মাসের শেষ পর্যন্ত আনুমানিক ১.৬৭ মিলিয়ন শরণার্থী এবং ১.৯২ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত সিরীয় নিজেদের এলাকায় ফিরে গেছেন।
এই প্রত্যাবর্তন একদিকে সিরিয়ার স্থিতিশীলতার প্রতি মানুষের আস্থার ইঙ্গিত। অন্যদিকে এটি নতুন চাপও তৈরি করছে।
ফিরে আসা মানুষের অনেকে এমন শহর ও গ্রামে যাচ্ছেন, যেখানে আগে থেকেই পর্যাপ্ত বাড়ি, চাকরি, পানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নেই। ফলে আবাসন, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবা নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এসব সমস্যার সমাধান না হলে যুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক ক্ষোভ আবারও নতুন সংঘাত তৈরি করতে পারে।
এ কারণেই শুধু দামেস্কে শক্তিশালী সরকার তৈরি করলেই হবে না। প্রাদেশিক ও পৌর কর্তৃপক্ষকে অর্থ, জনবল এবং স্থানীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতাও দিতে হবে।
সিরিয়ার বর্তমান সরকারের একটি সুবিধা অবশ্য রয়েছে।
বাশার আল-আসাদের সরকার ইরান ও রাশিয়ার ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল যে আন্তর্জাতিক দর-কষাকষিতে তার স্বাধীনতা কমে গিয়েছিল। বর্তমান দামেস্ক একই সময়ে ইউরোপ, উপসাগরীয় দেশ, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারছে।
সিরিয়ার বাজার ও পরিবহনপথে প্রবেশ করতে একাধিক পক্ষ আগ্রহী হওয়ায় দামেস্কের হাতে দর-কষাকষির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এমন চুক্তি করা সম্ভব, যেখানে অর্থের বড় অংশ সিরিয়াতেই থাকবে। স্থানীয় মানুষকে চাকরি দেওয়া, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে কাজে যুক্ত করা, রাস্তা ও বিদ্যুৎব্যবস্থা উন্নত করা এবং রাজস্বের একটি অংশ সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করার শর্ত আরোপ করা সম্ভব।
কিন্তু ভুলভাবে পরিচালিত হলে বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে।
সিরিয়া হয়তো হাজার হাজার ট্রাক পারাপার থেকে অর্থ পাবে, বন্দরে বিদেশি জাহাজ আসবে, পাইপলাইন দিয়ে লাখ লাখ ব্যারেল তেল যাবে এবং রেলপথে লাখ লাখ পণ্যবাহী কনটেইনার চলবে। কিন্তু সেই অর্থ যদি সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, বাড়িঘর ও স্থানীয় শিল্পে না পৌঁছায়, তাহলে দেশটি কেবল অন্যদের বাণিজ্যের পথ হয়েই থেকে যাবে।
এখানেই সিরিয়ার ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্নটি লুকিয়ে আছে।
একটি দেশ শুধু তার ভূগোলের কারণে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধ হয় না। সেই ভূগোল থেকে পাওয়া আয় কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে রাষ্ট্রটির ভবিষ্যৎ।
হরমুজ সংকট সিরিয়াকে বহু বছর পর এমন একটি সুযোগ দিয়েছে, যখন দেশটির হাতে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক আয়, আঞ্চলিক গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক দর-কষাকষির ক্ষমতা আসতে পারে।
ইরাকি তেল আবার সিরিয়া অতিক্রম করছে। হিজাজ রেলপথ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। কিরকুক-বানিয়াস তেল পাইপলাইন ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো বন্দর, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং পরিবহন অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে দামেস্ক নিজেকে পারস্য উপসাগর, কাস্পিয়ান সাগর, কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মাঝখানের বড় সংযোগস্থল হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে।
কয়েক বছর আগের সিরিয়ার সঙ্গে এই চিত্রের পার্থক্য বিশাল।
তবে সুযোগ যত বড়, ভুল সিদ্ধান্তের মূল্যও তত বেশি।
নতুন বিনিয়োগ যদি স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, দেশের বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরি হয় এবং বন্দর ও পরিবহনপথ থেকে পাওয়া অর্থ মানুষের জীবন পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সিরিয়া সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
কিন্তু বিদেশি শক্তির প্রতিযোগিতা যদি সিরিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, কয়েকটি গোষ্ঠী যদি বিনিয়োগের অধিকাংশ সুবিধা দখল করে নেয় এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত সাধারণ মানুষ যদি নতুন অর্থনীতির সুফল থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে পুরোনো সমস্যাই নতুন রূপে ফিরে আসবে।
তখন সিরিয়া মানচিত্রে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ হবে, কিন্তু সেই গুরুত্ব সিরীয়দের সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেবে না। দেশটি হয়তো অন্য রাষ্ট্রের তেল, পণ্য ও বাণিজ্য বহনের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি পথ হয়ে উঠবে, অথচ নিজের জনগণের জন্য শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে ব্যর্থ হবে।
তাই আজ দামেস্কের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সিরিয়া হরমুজের বিকল্প হতে পারবে কি না, সেটি নয়। ভূগোল ইতিমধ্যেই সেই সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে। আসল প্রশ্ন হলো, সিরিয়া কি এবার নিজের ভূগোলের মূল্য নিজের জনগণের জন্য ধরে রাখতে পারবে, নাকি আবারও সেই মূল্য অন্য শক্তির হাতে চলে যাবে?

