ভেনেজুয়েলায় চীনা ও রুশ কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্রের দায়িত্ব এবার নিতে যাচ্ছে একটি মার্কিন তেল কোম্পানি। সোমবার দুজন মার্কিন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এই কর্মকর্তাদের বরাত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ঘোষিত এক বড় তেল উৎপাদন চুক্তির আওতাতেই মার্কিন এই কোম্পানি এসব তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ পাবে। জানা গেছে, ভেনেজুয়েলা সরকার সম্প্রতি এই কোম্পানিকে চৌদ্দটি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। কোম্পানিটির মালিকানা এক সময় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের এক তেল ব্যবসায়ীর হাতে, বর্তমানে এর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ভেনেজুয়েলার একজন ব্যবসায়ীর কাছে।
এক বিবৃতিতে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন, প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিশ্রমী জনশক্তির কারণে ভেনেজুয়েলা সমৃদ্ধ একটি দেশ, আর এই চুক্তি সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর নতুন দুয়ার খুলে দেবে। তার ভাষায়, এটি ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের জনগণের জন্যই লাভজনক হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, মার্কিন কোম্পানিটি সংশ্লিষ্ট ব্যবসা পরিচালনার পূর্ণ কর্তৃত্ব পাবে। তবে কোম্পানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মালিকানার অধিকার থাকবে মার্কিন সরকারের হাতে। পাশাপাশি মোট উৎপাদনের এক-পঞ্চমাংশ তেল উৎপাদন খরচেই কেনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, বাকি অংশের তেল কেনার ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে প্রথম সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বিপুল প্রমাণিত তেলসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যার পরিমাণ প্রায় চৌষট্টি বিলিয়ন ব্যারেল। এই নতুন চুক্তির মধ্য দিয়ে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের চীনা ও রুশ প্রভাব হ্রাস পাবে, আর সেখানে তেল উৎপাদন ও বিক্রির সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, মার্কিন কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে, এবং পর্ষদের অধিকাংশ সদস্যকেও হতে হবে মার্কিন নাগরিক।
মোট সতেরোটি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার কথা রয়েছে এই মার্কিন কোম্পানির, যার মধ্যে চৌদ্দটি নতুন করে বরাদ্দ দিচ্ছে ভেনেজুয়েলা সরকার। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই চৌদ্দটি প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটি এতদিন পরিচালনা করত চীনা কোম্পানিগুলো, আর একটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল একটি রুশ প্রতিষ্ঠান—সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর আমলে চালু হওয়া ব্যবস্থার অধীনে এসব ক্ষেত্র পরিচালিত হয়ে আসছিল।
জানা গেছে, দুটি প্রকল্প পরিচালনা করত একটি চীনা প্রতিষ্ঠান, যার ওপর ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অভিযোগে ২০১৯ সালে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আরেকটি প্রকল্প পরিচালনা করত চীনের দুটি বড় রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে। এ প্রসঙ্গে এক মার্কিন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে শুধু মার্কিন সরকার ও কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না, বরং আগে যে তেল চীনে রপ্তানি হতো, তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যাবে।
মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানান, দুটি প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল মাদুরোর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর প্রতিষ্ঠান, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে রয়েছেন। আরেকটি তেলক্ষেত্রের সঙ্গে মাদুরোর স্ত্রীর এক আত্মীয়ের সংশ্লিষ্টতাও ছিল বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ভেনেজুয়েলা থেকে ইতিমধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল যুক্তরাষ্ট্রে আসতে শুরু করেছে, যা টেক্সাস ও লুইজিয়ানাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের শোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে। এ বিষয়ে মঙ্গলবার তেল ও গ্যাস খাতের খুচরা বিক্রেতা এবং শোধনাগার-মালিকদের সঙ্গে একটি বৈঠক করার কথাও রয়েছে তার।
এদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ এবং ২০১৫ সালে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধিদের মধ্যে পৃথকভাবে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য দেশটিতে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতা হস্তান্তর-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসন। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অবস্থান হলো, ২০১৫ সালের ওই জাতীয় পরিষদই ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ বৈধভাবে নির্বাচিত আইনসভা, যদিও বর্তমানে তাদের হাতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নেই।
এক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, এই পরিষদের সঙ্গে সমঝোতা হলে তা ভেনেজুয়েলায় বৃহত্তর ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার জন্য একটি সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা দেশটির তেলশিল্প পুনরুজ্জীবনের মতো বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথও সহজ করবে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি খাতকেন্দ্রিক এই কৌশলগত পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদে সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করছে, তেমনি লাতিন আমেরিকার এই গুরুত্বপূর্ণ দেশে চীন ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকেও সীমিত করার চেষ্টা করছে। তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে অমীমাংসিত জটিলতা এই পুরো প্রক্রিয়াকে ভবিষ্যতে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে।

