হিমালয় অঞ্চলের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে জনপদ ও উপত্যকাগুলো লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর নেপালে বন্যায় মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এখনো প্রায় ৪ হাজার নিখোঁজ মানুষের কাছে পৌঁছাতে ভারী যন্ত্রপাতি, হেলিকপ্টার ও এক্সক্যাভেটর ব্যবহার করে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
চীন, ভারত ও নেপালের বিশেষায়িত উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম এলাকায় পৌঁছাতে অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে হিমালয়ের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা শত শত শ্রমিককে উদ্ধারে এক্সক্যাভেটর ও অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূমিধসের সূত্র ধরে বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত চীন সীমান্তবর্তী নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়।
মৃতের সংখ্যা ১,০১০, নিখোঁজ প্রায় ৪ হাজার
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৪ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৯টি দেশের প্রায় ৫৯০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
দুর্যোগকবলিত অঞ্চলগুলো থেকে এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থাও পুনঃস্থাপন করা হয়েছে।
গতকাল সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, হাজার হাজার নাগরিক তাঁদের ঘরবাড়ি, পরিবার, প্রিয়জন ও সম্পদ হারিয়েছেন।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধার অভিযান জোরদার
দুর্যোগের পর থেকে নেপালের বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প উদ্ধার অভিযানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এসব প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকেরা আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ২৭৯ জন শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়েছে। নেপাল, ভারত ও চীনের যৌথ দল এসব এলাকায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে কাজ করছে।
নেপালের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সুড়ঙ্গে আটকে থাকা মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। এ জন্য সুড়ঙ্গের মুখ থেকে পানি সেচে বের করা, পাথর ও ধ্বংসস্তূপ সরানো এবং প্রবেশপথ তৈরির কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা।
দুর্যোগের পর প্রাথমিকভাবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ৯০০-এর বেশি কর্মী নিখোঁজ থাকার তথ্য সামনে এসেছিল। ধ্বংসস্তূপ ও কাদায় ভরে যাওয়া সুড়ঙ্গগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।
২১ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী মাঠে
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২১ হাজারের বেশি সদস্য বর্তমানে উদ্ধার, অনুসন্ধান, সরিয়ে নেওয়া ও ত্রাণ কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করে মানুষ ও ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারীদের অনেক জায়গায় বিকল্প পথ তৈরি করে এগোতে হচ্ছে। নুয়াকোটসহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে, যা উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণে সহায়তা করছে।
রসুয়া জেলার এক বেঁচে যাওয়া নারী জানান, তিনি আরও অনেক গ্রামবাসীর সঙ্গে হেঁটে নুয়াকোটে পৌঁছেছেন। তিনি বলেন, ‘পালানোর আগে আমাদের কোনো কিছু সঙ্গে নেওয়ার সময় ছিল না। আমরা যা পরে আছি, সেটিই আমাদের একমাত্র পোশাক; আর সেগুলোও বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।’
আসছে বৈদেশিক সহায়তা
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে নেপালকে সহায়তা করছে প্রতিবেশী দেশগুলোসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র। চীন দুর্গত এলাকায় আরও ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর পাশাপাশি ড্রোন, পানি বিশুদ্ধকরণ সরঞ্জাম এবং ডিএনএ পরীক্ষার বিশেষজ্ঞ পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়াও রসুয়া অঞ্চলে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তার জন্য ৪৪ সদস্যের একটি জরুরি ত্রাণ দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে। ওই অঞ্চলের একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকজন নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল গত সপ্তাহে সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে বিদেশি অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। তবে জীবন শনাক্তকারী যন্ত্র, বড় রেফ্রিজারেটর এবং প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড সেতুর মতো বিশেষায়িত সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছিল।
দুর্যোগের পর নেপাল সরকার ৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছে। এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।
জলবিদ্যুৎনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
চলতি শতাব্দীর শুরু থেকে নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটেছে। পাহাড়ি দেশটি হিমালয়ের পানিসম্পদ কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিদ্যুৎ রপ্তানির সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে চেয়েছে।
তবে এবারের বন্যা ও ভূমিধসে বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো পুনর্গঠনও নেপালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, এই দুর্যোগ প্রমাণ করে যে উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবীর কারণে হিমালয় অঞ্চল ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আমরা যেসব দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছি, তা আন্তর্জাতিক মহলের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরার সময় এসেছে।’
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও জানিয়েছে, গত সপ্তাহের বন্যাটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে নেপালের সরকার জানিয়েছে, দুর্যোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।
দুর্যোগের এক সপ্তাহ পরও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ধ্বংসস্তূপে ভরা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নিখোঁজ মানুষের বড় সংখ্যা উদ্ধারকারীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

