কোনও বন্দরে না থেমে রেকর্ড ২৫০ দিন সমুদ্রে কাটানোর পর পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থাইল্যান্ডের পাতায়ায় নোঙর করেছে। এর ফলে জাহাজটির প্রায় পাঁচ হাজার নাবিকের জন্য মিলেছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিশ্রামের সুযোগ।
রণতরীটি নোঙর করেছে সমুদ্রসৈকতনগরী পাতায়ার কাছাকাছি। শহরটি উচ্ছৃঙ্খল রাত্রিজীবন ও যৌন পর্যটনের জন্য পরিচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পাতায়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শক্তিশালী ঐতিহাসিক স্মৃতিও।
ক্লান্ত নাবিকরা যখন শহরের বার ও রেস্টুরেন্টগুলোতে প্রবেশ করবেন, তখন তারা আক্ষরিক অর্থেই সেই পথেই হাঁটবেন, যে পথে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশ্রাম ও অবকাশ যাপন (R&R) করতে আসা লক্ষাধিক মার্কিন সেনা হেঁটেছিলেন।
তাদের হাত ধরেই একসময় একটি শান্ত জেলেপল্লি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ও ব্যস্ত পার্টি শহরে পরিণত হয়।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব পাতায়াতেও
আজ সমুদ্রসৈকতের দিকে নেমে যাওয়া নিয়ন আলোয় আলোকিত গলিগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেকটাই শান্ত। শহরের বিখ্যাত ওয়াকিং স্ট্রিটের বারগুলো এখনও দেয়ালে পোল ড্যান্স করা নারীদের ভিডিও দেখিয়ে গ্রাহকদের ভেতরে টানার চেষ্টা করছে।
কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা পারিবারিক দল, যারা গো-গো বারের চেয়ে তুর্কি আইসক্রিম বিক্রেতাদের প্রতিই বেশি আগ্রহী বলে মনে হয়।
ইরান যুদ্ধ পর্যটন ও ভোক্তা ব্যয়ে প্রভাব ফেলায় এখানকার ব্যবসাগুলোও কঠিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমুদ্রে থাকার কারণে টানা নয় মাসের বেতন খরচ করতে না পারা হাজার হাজার মার্কিন নাবিকের আগমন স্থানীয় ব্যবসাগুলোর জন্য তাই একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে।
গত নভেম্বরে মার্কিন রণতরীটি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল প্রশান্ত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে ছয় মাসের দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে। তবে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর জাহাজটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠানো হয়।
সম্প্রতি কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য নাবিকদের মধ্যে খাবারের ঘাটতি, নষ্ট শৌচাগার এবং মানসিক চাপ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন নৌবাহিনী স্বীকার করেছে, কাজের পরিবেশ কঠিন ছিল। তবে তাদের দাবি, নাবিকরা পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছেন।
নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে পাতায়ায় রণতরীটির নোঙর করা নিয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাব দিতে অবশ্য মার্কিন নৌবাহিনী অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের স্মৃতি ফিরছে
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত মিত্র। দেশটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজের বন্দর সফরও পরিচিত ঘটনা।
তবে ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের পর সম্ভবত এই প্রথম কোনও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরাসরি এত বড় সংখ্যক মার্কিন সামরিক সদস্য পাতায়ায় এলেন।
“এই সফরই হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় আশা,” বলেন ওয়াকিং স্ট্রিটের কাছে রত্ন বিক্রি করা দোকান মালিক অনন সাইতি।
তার দোকানে মার্কিন নাবিক ও মেরিনদের স্বাগত জানিয়ে বড় একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। তাদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে বিশেষ ছাড়ও।
“হারানোর কিছু নেই আমাদের। আমরা শুধু আশা করছি, তারা এখানে কিছু অর্থ ব্যয় করবেন।”
বিতর্ক এড়াতে কড়াকড়ি থাই কর্তৃপক্ষের
তবে মার্কিন ও থাই কর্মকর্তারা চেষ্টা করছেন, সফরটি এমনভাবে সম্পন্ন করতে যাতে পাতায়াকে ঘিরে পরিচিত কুরুচিপূর্ণ শিরোনাম তৈরি না হয়।
থাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েকটি স্থানে মার্কিন নারী ও পুরুষ সেনাসদস্যদের যেতে দেওয়া হবে না।
এর একটি হলো সোই ৬। প্রধান সমুদ্রসৈকতের দিকে নেমে যাওয়া এই এলাকা উসকানিমূলক গো-গো বারের ঘনত্বের জন্য পরিচিত।
থাই পুলিশ মার্কিন অতিথিদের মনে করিয়ে দিয়েছে, থাইল্যান্ডে পতিতাবৃত্তি আইনত অবৈধ।
তবে ধারণা করা হয়, শহরটিতে প্রকৃতপক্ষে ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার যৌনকর্মী রয়েছেন। তাদের অনেকেই সোই ৬ এলাকায় কাজ করেন। সেখানে তারা বারের বাইরে দাঁড়িয়ে পুরুষদের ভেতরে আসার অনুরোধ জানান।
পাতায়ার অসংখ্য গাঁজার দোকানও মার্কিন নাবিকদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা। একই সঙ্গে প্যারাগ্লাইডিং ও জেট-স্কির মতো সমুদ্রভিত্তিক বিনোদন কার্যক্রমও তাদের জন্য নিষিদ্ধ।
“এটা তাদের সিদ্ধান্ত,” বিবিসিকে বলেন মেয়র পরামাসে নগামপিচেতস।
“মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।”
নাবিকদের জন্য শাটল ও হোটেল
রণতরীটি থাইল্যান্ডে অবস্থানকালে প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত বন্দর থেকে পাতায়া শহরে যাতায়াতের জন্য শাটল বাসের ব্যবস্থা করেছে মার্কিন নৌবাহিনী।
যেসব মার্কিন নাবিক স্থলে এক রাত কাটিয়ে কিছুটা বিলাসিতা করতে চান, তাদের জন্য দুটি হোটেল নির্ধারণ করা হয়েছে।
থাই কর্তৃপক্ষ শহরের বিনোদন এলাকাগুলোতে নজরদারির জন্য শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসাগুলোকে মার্কিন অতিথিদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ না নিতে সতর্ক করা হয়েছে।
মেয়র পরামাসে বলেন, “৫০ থেকে ৬০ বছর আগে মার্কিন সামরিক সদস্যদের সফরই পাতায়াকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তোলে এবং এটিকে একটি পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করে।”
তিনি বলেন, “খোলাখুলি বলতে হবে, বারকর্মী নারীদের জন্য শহরটির একটি সুনাম বা পরিচিতি আছে। আমরা এই ধারণাগুলো বুঝি। আমরা তা থামাতে পারি না।”
“তবে আমরা যা করতে পারি, তা হলো দেখানো যে পাতায়া বদলেছে। এখন আমাদের কাছে খেলাধুলা, সেমিনার, সুস্থতাভিত্তিক আয়োজন এবং পরিবারবান্ধব নানা কার্যক্রম আছে।”
“এখানে সবকিছুরই একটি মিশ্রণ রয়েছে।”
দুই দেশই আশা করছে, ৬ সেপ্টেম্বর ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরার দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার সময় এর নাবিকরা হবে আরও সতেজ ও বিশ্রামপ্রাপ্ত।
সূত্র: বিবিসি

