যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেই নাগরিকত্ব পাওয়ার দীর্ঘদিনের নিয়ম পরিবর্তনের যে চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা আবারও আদালতের বাধার মুখে পড়েছে। দেশটির একটি ফেডারেল আদালত ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশ কার্যকর করার ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিধান অনুযায়ী, সাধারণভাবে মার্কিন ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া শিশুরা জন্মের পর থেকেই দেশটির নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়ম যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
তবে এই নিয়মে কিছু সীমিত ব্যতিক্রম রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের এই অধিকার সীমিত করার উদ্যোগ নিয়ে আসছেন। এর আগেও তার একই ধরনের পদক্ষেপ আদালতের বাধার মুখে পড়েছিল।
গত ৬ আগস্ট ট্রাম্প নতুন একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। ওই আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নিয়মে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের জেলা আদালতের বিচারক ডেবোরাহ বোর্ডম্যান ওই আদেশ কার্যকর করার ওপর প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অধিকারকর্মী সংগঠনগুলো আইনি আবেদন করার পর আদালত এই সিদ্ধান্ত নেন।
বিচারক ডেবোরাহ বোর্ডম্যান তার ৩৫ পৃষ্ঠার রায়ে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়ে এর আগেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।তিনি বলেন, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করা শিশুরা জন্মের সময় থেকেই মার্কিন নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিচারকের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের আগস্টের নির্বাহী আদেশ অসাংবিধানিক হওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট স্পষ্ট।ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এই উদ্যোগের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ‘জন্ম পর্যটন’ বন্ধ করার কথা বলেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো শিশুর নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনাকে জন্ম পর্যটন বলা হয়।
মার্কিন আইন অনুযায়ী, শুধু সন্তান জন্ম দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ অনুমোদিত নয়। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের একটি অংশ হিসেবে দেখছে।
নতুন নির্বাহী আদেশেও এই ধরনের পরিস্থিতি লক্ষ্য করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপের চেষ্টা করা হয়েছিল।
এটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম চেষ্টা নয়। এর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার জন্য একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন।
সেই আদেশে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী বা অস্থায়ী ভিসায় থাকা বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিকত্ব পাবে না।
তবে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হয়। নিম্ন আদালত শুরুতেই এই উদ্যোগের ওপর বাধা দেয়।
আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত ধারার অধীনে দেশটির ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া প্রায় সবাই নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতও এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়।আদালতের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো।
মেরিল্যান্ডভিত্তিক সংগঠন ‘উই আর কাসা’র আইনবিষয়ক পরিচালক শানা খাদার বলেন, এর আগেও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার প্রচেষ্টা সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এবারও আদালতে প্রশাসনের অবস্থান টেকেনি।
অধিকারকর্মীদের মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। তাই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে এই নিয়ম পরিবর্তনের চেষ্টা সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন।তার প্রশাসন অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, বহিষ্কার কার্যক্রম বাড়ানো এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের জন্য থাকা কিছু সুরক্ষা বাতিলের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগও এই বৃহত্তর অভিবাসন নীতির অংশ।তবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে চলমান বিতর্কের কারণে এই বিষয়ে আইনি লড়াই এখনো অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান ভবিষ্যতেও আদালতের নজরদারির মধ্যে থাকবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।

