যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতের শেষ কোথায়, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো উত্তর দিতে পারেনি ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘যুদ্ধ’ বলা ঠিক হবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি জানাতে পারেননি, এই সংঘাত কবে শেষ হবে কিংবা সাধারণ মানুষের ওপর এর প্রভাব আর কতদিন থাকবে।
ভ্যান্সের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মাত্রা কম দেখানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা প্রশ্ন।
হোয়াইট হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স দাবি করেন, কয়েক মাস আগেই সক্রিয় যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ হয়েছে। তার মতে, বর্তমানে বড় ধরনের যুদ্ধ চলছে না। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা যাচ্ছে, চলতি সপ্তাহে টানা তিন দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ হয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালীর আশপাশেও হামলার ঘটনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ হিসেবে স্বীকার না করার পেছনে রাজনৈতিক হিসাবও থাকতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে এবং দীর্ঘস্থায়ী কোনো সামরিক সংঘাত সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৭৯০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন এবং ১৮ জন নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর আশপাশে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে। ওই অভিযানে প্রায় ৬০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার স্থাপনা, নৌ-সম্পর্কিত অবকাঠামো, মাইন স্থাপনের সক্ষমতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান আবারও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে পারে বলে তারা ওই অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করছেন, এই সংঘাতের দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উদ্বেগের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও সামরিক পাহারা দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবুও অনেক জ্বালানি কোম্পানি এই পথে চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত হলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
এই সংকটের মধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগও খুব বেশি এগোয়নি। ভ্যান্স এর আগে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন এবং তার মধ্যস্থতায় গ্রীষ্মের শুরুতে একটি যুদ্ধবিরতিও হয়েছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই ভেঙে যায়। এরপর আবারও দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলার পথে ফিরে যায়।
আগস্ট মাসে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার পর আবার উত্তেজনা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল—এমন তথ্যের ভিত্তিতেই তারা ইরানের সামরিক অবস্থানে হামলা চালিয়েছে।
তবে এই হামলাকে ঘিরে বেসামরিক মানুষের হতাহতের অভিযোগও উঠেছে। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন নিহত হওয়ার খবরের বিষয়ে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনিচ্ছাকৃত ঘটনা ঘটতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে কোনো আলোচনা চলছে না বলেও জানিয়েছেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় ফিরবে না।
সংঘাত কবে শেষ হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, এটি মূলত নির্ভর করছে ইরান কবে জাহাজ চলাচলে হামলা বন্ধ করবে তার ওপর। একইভাবে জ্বালানির দাম কবে আবার স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়েও তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি।
ভ্যান্সের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এই লক্ষ্য কতটা অর্জন করা সম্ভব, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সংঘাত নিয়ে চাপ বাড়ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার পদত্যাগ ও অপসারণ নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রধান ড্যান ড্রিসকলের পদত্যাগও সেই আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।
তবে ভ্যান্স এসব পরিবর্তনকে সংকট হিসেবে দেখছেন না। তিনি দাবি করেছেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংস্কারের কাজ চলছে এবং এসব পরিবর্তন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার অংশ।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখনো অনিশ্চিত এক পর্যায়ে রয়েছে। ওয়াশিংটন এটিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ বলতে না চাইলেও সামরিক কার্যক্রম, পাল্টা হামলা এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা দেখাচ্ছে যে সংকট এখনো শেষ হয়নি। সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে দুই দেশের সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং সম্ভাব্য নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।

