ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার প্রচেষ্টার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনের অবস্থান। ওয়াশিংটন যখন তেহরানের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে, তখন বেইজিং ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তবে চীনের এই অবস্থান কোনো আবেগ, আদর্শিক সমর্থন বা রাজনৈতিক বন্ধুত্বের কারণে নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক হিসাব ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ।
ইরান সংকট এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে বিশ্ব রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বড় শক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চীন, কারণ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে বেইজিং নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
৩১ আগস্ট চীন, রাশিয়া ও ভারতের নেতারা কিরগিজস্তানের বিশকেকে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নেন। এই বৈঠকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও উপস্থিত ছিলেন। ১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সম্মেলনের ঘোষণায় এমন একটি নতুন উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের আহ্বান জানানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় আরও স্বাধীন ভূমিকা রাখবে। এই উদ্যোগকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
এই সম্মেলনটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে দূরে রাখা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বড় কিছু দেশ সেই নীতি পুরোপুরি অনুসরণ করছে না। এর মধ্যে চীনের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
চীন ইরানের পাশে রয়েছে, তবে সেটি কোনো নিঃশর্ত সমর্থন নয়। বেইজিংয়ের কাছে মূল বিষয় হলো নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে চীনের আচরণের ওপর। কারণ চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতাদের একটি। দেশটি ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে, যা ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন বিকল্প বাণিজ্যিক পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।
চীনের দৃষ্টিতে তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। বেইজিং মনে করে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একাধিক বাণিজ্যিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে চীন বুঝেছে যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরানের সঙ্গে চীনের অনেক বাণিজ্যিক লেনদেন এমন পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সীমিত। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং পণ্য বিনিময়ের মতো ব্যবস্থা ব্যবহারের কারণে এসব বাণিজ্যিক কার্যক্রম মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব থেকে অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বড় চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ প্রয়োগ করতে পারে। কিন্তু এর ফলে চীনের পাল্টা পদক্ষেপের ঝুঁকি তৈরি হবে। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন এমন একটি বড় সংঘাত তৈরি করতে চায় না, যা তাদের নিজেদের অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়াতে পারে।
চীনের ইরান নীতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো, ইরানের দুর্বলতা চীনের আঞ্চলিক স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বেইজিং মনে করে, ইরান যদি বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ আবারও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে।
এতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বাড়তে থাকা প্রভাব কমে যেতে পারে। বর্তমানে চীন এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইরানের অবস্থান দুর্বল হলে এসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তাও চীনের জন্য একটি বড় বিষয়। দেশটির মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এবং এর মধ্যে ইরানের অংশ প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব অতিরিক্ত বেড়ে গেলে চীনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে চীন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক বা রাজনৈতিক জোট গড়ে তুলতে চাইছে। বাস্তবে বেইজিং খুব সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, কিন্তু একই সঙ্গে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নত করতে চায়।
চীনের আশঙ্কা হলো, ইরান যদি আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই বেইজিং এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে যেখানে তারা ইরানকে পুরোপুরি ছেড়েও দিচ্ছে না, আবার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতাও দেখাচ্ছে না।
সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনেও এই নীতি স্পষ্ট হয়েছে। চীনের নেতা রাশিয়া ও ভারতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেননি। এর মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে—ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সীমাহীন নয়।
একই সময়ে চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনো গভীর। তাই ইরান ইস্যুতে চীন এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চায় না, যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় সংঘাত তৈরি করবে।
২০২৬ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফর করেন। সেই সফরে দুই দেশ কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা করে। চীন ইরানকে অস্ত্র সহায়তা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল।
তবে ওয়াশিংটন এটাও জানে যে ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি বন্ধ করা সহজ নয়। কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের সঙ্গে জড়িত।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি আগের মতো সহজে কাজ করছে না। বিশ্বের বড় অর্থনৈতিক শক্তিগুলো এখন নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। চীনের অবস্থান তারই একটি উদাহরণ।
ইরান সংকটের স্থায়ী সমাধান শুধু নিষেধাজ্ঞা বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন আলোচনার পথ এবং এমন একটি কূটনৈতিক সমাধান, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনা করা হবে।
শেষ পর্যন্ত ইরান ইস্যুতে চীনের অবস্থান একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে—বর্তমান বিশ্বে কোনো একক শক্তি একাই সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারছে না। অর্থনীতি, কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয়ই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি।

