ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্সি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, তার প্রশাসন বারবার এমন পথ বেছে নিচ্ছে যেখানে সরাসরি আইন ভাঙার বদলে আইনের ফাঁক, ব্যাখ্যার সুযোগ বা প্রশাসনিক ক্ষমতার সীমা ব্যবহার করে নিজেদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে আদালত বা কংগ্রেসের আপত্তি থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসন আগে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, পরে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে। এই কৌশলকে অনেকে তুলনা করছেন হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা “Catch Me If You Can”-এর মতো, যেখানে একজন ব্যক্তি বারবার নিয়মের সীমা এড়িয়ে পালিয়ে বেড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, জীবিত কোনো প্রেসিডেন্টের ছবি সাধারণ মুদ্রায় থাকার কথা নয়। কিন্তু ট্রাম্পের মুখযুক্ত স্মারক মুদ্রা বাজারে এসেছে। প্রশাসন যুক্তি দিয়েছে, এটি সাধারণ মুদ্রা নয়, বরং বিশেষ স্মারক মুদ্রার আওতায় পড়ে।
আরেকটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সময় বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে দেশকে জড়াতে পারেন না। কিন্তু ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, তারা আইন লঙ্ঘন করেনি এবং সামরিক কার্যক্রমের ধরন ভিন্ন।
সমালোচকদের মতে, অতীতের অনেক প্রেসিডেন্টও এই আইনের সীমা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছেন, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পদ্ধতি আরও আক্রমণাত্মক।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে একটি বড় বলরুম নির্মাণের পরিকল্পনা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস এক পর্যায়ে মন্তব্য করেন যে, এই প্রকল্পটি “সম্ভবত বেআইনি” হতে পারে। তবে আদালতের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও নির্মাণকাজ এগিয়ে চলছে।
রবার্টস তার মতামতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিলের একটি বক্তব্য উল্লেখ করেন—“আমরা আমাদের ভবন তৈরি করি, এরপর সেই ভবনগুলো আমাদের তৈরি করে।” চার্চিল এই কথা বলেছিলেন একটি জাতীয় প্রতীক পুনর্গঠনের প্রসঙ্গে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের প্রকল্পটি একটি রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্মৃতিচিহ্ন তৈরির প্রচেষ্টার মতো দেখাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে আইন পাশ কাটানোর অভিযোগ উঠেছে। আর্লিংটন ন্যাশনাল সেমেটারির কাছে একটি বিজয় তোরণ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যদিও এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে। মাদক পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন নৌযানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে সমালোচকেরা বলছেন—বিচার ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এছাড়া কংগ্রেসের তৈরি কিছু সরকারি সংস্থা যেমন USAID, শিক্ষা বিভাগ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও প্রশাসন নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী অর্থ আটকে দেওয়া বা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগের মুখে পড়েছে।
অভিবাসন অভিযানে বিচারিক অনুমতি ছাড়া বাড়িতে প্রবেশের বিষয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের স্বাধীনতার বিষয়েও ট্রাম্প চাপ সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের একটি নির্দিষ্ট ধরণ তৈরি হয়েছে—প্রথমে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা, পরে আদালতে বিষয়টি মোকাবিলা করা। যদি আদালত শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিলও করে, ততদিনে অনেক পরিবর্তন বাস্তবে ঘটে যায়। কোনো ভবন ভেঙে ফেললে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন। কোনো সরকারি প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে বা গবেষণার অর্থ কেটে দিলে সেই ক্ষতি দ্রুত পূরণ করা যায় না।
এই কারণেই অনেকে বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল হলো—ধরা পড়ার আগেই যতটা সম্ভব পরিবর্তন করে ফেলা।
হোয়াইট হাউস বলরুম প্রকল্প নিয়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের অবস্থান ছিল শুধুমাত্র একটি ভবন নিয়ে নয়; বরং তিনি এটিকে সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস ও আদালতের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রাখা হয়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার সেই ভারসাম্যকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
সুপ্রিম কোর্ট কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত আটকে দিয়েছে। যেমন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের চেষ্টা এবং শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে আদালত বাধা দিয়েছে। তবে অনেক বিষয়ে আদালত ও কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া ধীর হওয়ার কারণে প্রশাসন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে বলে সমালোচকদের দাবি।
আগামী নির্বাচনে যদি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারা ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে অর্থায়ন ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ততদিনে যে পরিবর্তনগুলো হয়ে যাবে, সেগুলো কি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব?
ট্রাম্পের মুদ্রা বাজার থেকে সরানো কঠিন হতে পারে। যাদের যথাযথ শুনানি ছাড়া বহিষ্কার করা হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। আর গবেষণা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি পূরণ করতেও সময় লাগবে।
শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্নটি থেকে যায়—আইন ভঙ্গ হয়েছে কি না, তা আদালত হয়তো পরে নির্ধারণ করবে। কিন্তু এর মধ্যে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো কি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে?

