ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোয় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই শীর্ষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার।
রুশ-মার্কিন এই বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন যুদ্ধ বন্ধে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এর আগে বৈঠকের কয়েক দিন আগে সিআইএর প্রধান জন র্যাটক্লিফও বিরল এক সফরে মস্কো গিয়েছিলেন।
তবে পুতিনের সঙ্গে উইটকফ ও কুশনারের বৈঠকে ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে মস্কো বা ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
রুশ রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কোয় পুতিনের সরকারি বাসভবনে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠকটি চলে। রুশ প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বৈঠকটিকে ‘গঠনমূলক ও অত্যন্ত খোলামেলা’ বলে বর্ণনা করেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনায় শুধু ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধান নয়, অর্থনৈতিক বিষয় এবং রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য বড় ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
উশাকভ আরও বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ সেনাবাহিনীর অগ্রগতির বিষয়টিও আলোচনায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে সংঘাতের মূল কারণগুলো সমাধানের জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।
এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, উইটকফ ও কুশনার যুদ্ধ শেষ করার একটি প্রস্তাব নিয়ে রাশিয়ায় যাচ্ছেন। বৈঠকে পুতিনও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন বলে জানান।
পুতিন বলেন, যাই ঘটুক না কেন, এ ধরনের যোগাযোগ সবসময়ই উপকারী। একই সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
অন্যদিকে, বৈঠকের আগে উইটকফ ইউক্রেনের সঙ্গে তিন দিনের জন্য একে অপরের রাজধানীতে হামলা বন্ধ রাখার বিষয়ে সম্মত হওয়ায় পুতিনকে ধন্যবাদ জানান।
রুশ গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পুতিন তিন দিনের জন্য কিয়েভে হামলা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ইউক্রেনের রাজধানীর বাইরে দেশটির অন্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে রোববার কিয়েভে যাওয়ার কথা রয়েছে উইটকফ ও কুশনারের। যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এগিয়ে নিতে ইউক্রেনের রাজধানীতে এটিই তাদের প্রথম সফর।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি এরই মধ্যে ট্রাম্পের দূতদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের কিয়েভ সফরের অপেক্ষায় রয়েছেন।জেলেনস্কি বলেন, তারা একটি ফলপ্রসূ আলোচনার জন্য প্রস্তুত।
তবে ইউক্রেনের আকাশসীমা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ থাকায় মস্কো থেকে মার্কিন প্রতিনিধিরা কীভাবে কিয়েভে যাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জেলেনস্কি অবশ্য জানিয়েছেন, তাদের সফরের সময় আকাশপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক সংঘাতও অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে বিমান হামলা আরও জোরদার করেছে।
জেলেনস্কির দাবি, ট্রাম্পের দূতদের সঙ্গে পুতিনের বৈঠকের আগে রাশিয়া রাতভর কিয়েভ ও বোরিসপিল বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে।
রাশিয়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বাড়িয়েছে বলেও জানিয়েছে ইউক্রেন। এসব হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেনকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। পাল্টা হিসেবে ইউক্রেনও রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনী কিছু অগ্রগতি করলেও তাদের অগ্রযাত্রা বেশিরভাগ সময়ই ধীরগতির ছিল এবং এতে ব্যাপক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
এর মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে মস্কো ও কিয়েভে আলোচনা শুরু হওয়ায় কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না, কিংবা এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধের পথ তৈরি করতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

