গাজার উত্তরাঞ্চলে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা প্রায় ১০০ জনের দেহাবশেষের দাফন সম্পন্ন করেছেন ফিলিস্তিনিরা। নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬০ জন শিশু ছিল বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
রোববার গাজার জেইতুন এলাকার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা এসব দেহাবশেষ পরিবারের সদস্যরা নিয়ে যান কেন্দ্রীয় গাজা সিটির আল-মামাদানি কবরস্থানে। সেখানে তাদের দাফন করা হয়।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দল ও পরিবারের সদস্যরা কয়েক সপ্তাহ ধরে ধ্বংস হওয়া বাড়িঘরের নিচে উদ্ধার অভিযান চালানোর পর এসব দেহাবশেষ পাওয়া যায়। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের সময় ধ্বংস হওয়া এসব ভবনের নিচে এখনো হাজারো মানুষের দেহাবশেষ চাপা পড়ে আছে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধার হওয়া অনেকেই মালাকা পরিবারের সদস্য। শুধু এই একটি পরিবারেই ৫৫ জন সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।
গাজায় আল-জাজিরার প্রতিবেদক গাজি আল-আলৌল বলেন, অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলেন যেন তারা তাদের স্বজনদের একটি পরিচিত ও যথাযথ কবরস্থানে দাফন করতে পারেন। তবে সব পরিবার সেই সুযোগ এখনো পায়নি।
তিনি বলেন, উদ্ধার করা দেহাবশেষ অনেক সময় সম্পূর্ণ দেহ নয়, বরং হাড়ের অংশ এবং ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের অবশিষ্টাংশ। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এমন চিত্র বেশি দেখা গেছে।
তার মতে, উদ্ধারকাজ দ্রুত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব এবং বিভিন্ন বাধার কারণে ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগছে।
গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রধান রায়েদ আল-দাহশান বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো আনুমানিক ৮ হাজার মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে। প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে প্রায় ৯০ দিনের মধ্যে উদ্ধার অভিযান শেষ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, বর্তমানে উদ্ধারকর্মীদের কাছে পর্যাপ্ত খননযন্ত্র, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অনুসন্ধান প্রযুক্তি নেই। এসব সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশ করতে না পারলে উদ্ধারকাজ শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
দাহশান জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির তালিকা দেওয়া হয়েছে। এমনকি এসব সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যাতে উদ্ধারকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া যায়।
ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা দেহাবশেষ শনাক্ত করতে জীবিত স্বজন ও প্রতিবেশীদের তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন ভবনে কারা ছিলেন এবং হামলার সময় তারা কোথায় অবস্থান করছিলেন—এসব তথ্যের ভিত্তিতে শনাক্তকরণের চেষ্টা চলছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রধান অজিত সুনগে বলেন, এই দৃশ্য সংঘাতের ভয়াবহতার কথা মনে করিয়ে দেয়। কিছু দেহাবশেষ ২০২৩ সালের নভেম্বরের সময়কার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, গাজার অনেক এলাকায় এখনো হাজারো মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। বিশেষ করে যেসব এলাকা সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে, সেখানে উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য উদ্ধার হওয়া প্রমাণ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৬৫১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯২ জন আহত হয়েছেন।
এর আগে সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি উদ্ধার অভিযানে একক হামলায় নিহত আবু শরিয়া ও হাসানিয়া পরিবারের শতাধিক মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া আল-তাজ টাওয়ার ধ্বংসস্তূপ থেকেও ৫০০-এর বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

