ভারতের রাজধানী দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে একটি ছয়তলা ভবন হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে। ভবনটির নাম ‘হোস্টেল ডেজ’ দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে অবস্থিত একটি ছেলেদের পেয়িং গেস্ট (পিজি) হোস্টেল। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও কতজন আটকে আছেন, তা নিশ্চিত নয়। তবে স্থানীয় বিধায়ক অনিল শর্মা বলেছেন, আটকে পড়া বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে মোবাইল ফোনে কল করে বাঁচানোর আকুতি জানাচ্ছেন।
দুর্ঘটনাটি ঘটে দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকার প্যায়ারেলাল রোডে, শিব মন্দিরের কাছে। দিল্লি ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, দুপুর ১টা ৩৩ মিনিটে প্রথম ভবন ধসের খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের ১২টির বেশি গাড়ি। পুলিশ, জরুরি চিকিৎসাসেবা দল এবং জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ শুরু করে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে জেসিবি মেশিনও মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ভবনটিতে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। রোববার ছুটির দিন হওয়ায় ঘটনার সময় বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ভবনের ভেতর ছিলেন। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে উদ্ধার করে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (এইমস) ট্রমা সেন্টারে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা। উদ্ধার করা আরও কয়েকজনকে নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় বিধায়ক অনিল শর্মা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পড়াশোনা করতে আসা শিক্ষার্থীরা এই ভবনে থাকতেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে পাঁচ, দশ নাকি বিশজন, যে সংখ্যাই হোক, অনেকে যে এখনও আটকা পড়ে আছেন, তা নিশ্চিত।’ তিনি আরও জানান, আটকে পড়া কিছু শিক্ষার্থী ফোন করছেন, যা প্রমাণ করে তারা বেঁচে আছেন। তাদের সবাইকে নিরাপদে বের করে আনাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ধসে পড়া ভবনটির বেজমেন্টে বা ভূগর্ভস্থ অংশে কিছু দিন ধরে নির্মাণকাজ চলছিল। স্থানীয়দের ধারণা, এই নির্মাণকাজই ভবনটি ধসে পড়ার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ভবনটির ওপরের অংশ শক্তিশালী করা হলেও নিচের স্তম্ভগুলো দুর্বল ছিল। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনও ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার ভেসে আসছে। একটি প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজ শুরুর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা ধ্বংসস্তূপ খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেছিলেন।
এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশীষ সুদ। মুখ্যমন্ত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজে একাধিক সংস্থা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে এবং পুরো পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ধসে পড়া ভবনের পাশের ভবনটিও খালি করে দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত মে মাসে দক্ষিণ দিল্লির সাকেত মেট্রো স্টেশনের কাছে একই ধরনের ভবন ধসের ঘটনায় ছয়জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সেই ঘটনার তদন্তে মিউনিসিপাল করপোরেশন অফ দিল্লিকে (এমসিডি) দায়ী করা হয়েছিল।
এই দুর্ঘটনা আবারও তুলে ধরছে দিল্লিতে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণের ভয়াবহ চিত্র। কংগ্রেস নেতা অভিষেক দত্ত বলেছেন, ‘শিশুরা যেভাবে এখানে প্রাণ হারাচ্ছে এবং দিল্লিতে ভবনগুলো কীভাবে ধসে পড়ছে, তা নির্বাচনের চেয়েও বড় সমস্যা।’ আপাতত উদ্ধারকাজ চলছে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এখনও ফোন আসছে; আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের বাঁচার আকুতি। কতজন বেঁচে উঠবেন, কতজন পারবেন না; সেটা এখন সময়ই বলে দেবে।

