নরওয়ের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির ১৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত। কোথাও নেই কাঁটাতারের বেড়া বা উঁচু প্রাচীর। তবে সীমান্তজুড়ে রয়েছে নজরদারি ক্যামেরা, সামরিক পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং নিয়মিত টহল।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরওয়ের কিরকেনেস শহর থেকে এখন পায়ে হেঁটে পর্যটকদের রাশিয়া-নরওয়ে সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সীমান্তের কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাও এসব ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
কিরকেনেস উত্তর-পূর্ব নরওয়ের একটি ছোট শহর। ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার কাছাকাছি একটি খাঁজকাটা উপসাগরীয় এলাকায় অবস্থিত শহরটি উত্তর মেরু অঞ্চলে ছোট জাহাজভ্রমণের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেষ গন্তব্য হিসেবেও পরিচিত। তবে সম্প্রতি স্থানীয় পর্যটন প্রতিষ্ঠানগুলো সীমান্তকেন্দ্রিক ভ্রমণেও সম্ভাবনা দেখছে।
জাহাজ থেকে নামা পর্যটকদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ন্যাটোর সবচেয়ে উত্তরের স্থলসীমান্তে। সেখানে নরওয়ে ও রাশিয়াকে আলাদা করেছে বেড়াহীন একটি সীমারেখা।
বন, জলাভূমি আর অদৃশ্য প্রহরা
সীমান্তের আশপাশের বন ও তৃণভূমির মধ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি উন্মুক্ত হাঁটার পথ। গাছের মধ্যে ঝোলানো ক্যামেরা, দূরের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং সামরিক টহল পর্যটকদের মনে করিয়ে দেয়, এটি সাধারণ কোনো পর্যটনপথ নয়।
সীমান্ত চিহ্নিত করতে নির্দিষ্ট খুঁটি বসানো আছে। নরওয়ের অংশে হলুদ এবং রাশিয়ার অংশে লাল রঙের চিহ্ন দেখা যায়।
পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত প্রায় তিন ঘণ্টার হাঁটার পথ পাসভিক নদীর সমান্তরালে প্রায় এক কিলোমিটার এগিয়ে যায়। এরপর পৌঁছাতে হয় প্রায় আট মিটার প্রশস্ত ‘সীমান্ত করিডরে’। গাছপালা পরিষ্কার করে রাখা এই অংশটি দুই দেশের মধ্যবর্তী নিরপেক্ষ এলাকা হলেও সেখানে পর্যটকদের প্রবেশের অনুমতি নেই।
এরপর পথ উঠে গেছে রুসেহোগদা নামের পাহাড়ি এলাকায়। সেখান থেকে দেখা যায় স্তরস্কগ সীমান্ত তল্লাশিকেন্দ্র, যা নরওয়ে ও রাশিয়ার মধ্যে বৈধ স্থলপথে যাতায়াতের একমাত্র সীমান্ত।
সীমান্ত এলাকায় যাওয়ার আগে পর্যটকদের নিরাপত্তা সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়। সীমান্তের দিকে পাথর ছোড়ার মতো ছোটখাটো কাজের জন্যও বড় অঙ্কের জরিমানা হতে পারে। চিহ্নিত আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করলে আটক হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

রাশিয়া সীমান্ত দেখতে পর্যটকদের আগ্রহ কেন
সীমান্তভ্রমণের পথপ্রদর্শক হেনরিক হফম্যান ২০২৫ সাল থেকে এসব ভ্রমণ পরিচালনা করছেন। ২০২১ সালে তিনি কিরকেনেসে বসবাস শুরু করেন। তাঁর ভাষ্য, এরপর রাশিয়া ও নরওয়ে উভয় দেশই সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়িয়েছে।
বিবিসিকে হফম্যান বলেন, নরওয়ের উপকূল ঘুরে জাহাজ ও বাসে কিরকেনেসে আসা অনেক পর্যটক প্রচলিত ভ্রমণের বাইরে গিয়ে রাশিয়া ও নরওয়ের সীমান্ত কাছ থেকে দেখতে আগ্রহী।
বিশেষ করে বয়স্ক পর্যটকদের আগ্রহ বেশি। তাঁদের অনেকেই শীতল যুদ্ধের সময়ের কথা মনে রেখেছেন এবং কয়েক দশক ধরে ইউরোপ ও রাশিয়ার সম্পর্কের পরিবর্তন দেখেছেন।
হফম্যানের মতে, এই হাঁটার পথ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ দেয় না, রাশিয়ার পাশের অঞ্চলের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতাও বোঝার সুযোগ তৈরি করে।
কিরকেনেসে সীমান্তভ্রমণের আয়োজনকারী নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কিরকেনেস ট্যুরস। তবে এর আগে থেকেই এ ধরনের ভ্রমণ পরিচালনা করছে অন্য প্রতিষ্ঠান।
বিবিসি জানায়, হাভিলা ভয়েজেস ২০০০ সাল থেকে পর্যটকদের এই এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। হুর্টিগ্রুটেন জানিয়েছে, তাদের নরওয়েজিয়ান বর্ডার ভ্রমণ সম্প্রতি কিরকেনেসে পরিচালিত আটটি ভ্রমণপথের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছে। ওই ভ্রমণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি পরমাণু বোমা আশ্রয়কেন্দ্রও দেখানো হয়।
সীমান্তের ইতিহাসে রাশিয়া ও ফিনল্যান্ডের ছাপ
রাশিয়ার সঙ্গে কিরকেনেসের সম্পর্ক শুধু বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে নয়। শহরটির ইতিহাসে রাশিয়া ও ফিনল্যান্ডেরও গভীর প্রভাব রয়েছে।
কিরকেনেস নরওয়ের একমাত্র শহর, যেখানে রাস্তার নামের ফলকে নরওয়েজিয়ান ও রুশ—দুই ভাষাই ব্যবহার করা হয়।
শহরের কেন্দ্রের কাছে রয়েছে রাশিয়া যুদ্ধের একটি বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৪৪ সালে নাৎসি দখল থেকে লাল ফৌজ কিরকেনেসকে মুক্ত করার স্মরণে এটি নির্মাণ করা হয়।
কাছের সীমান্তভূমি জাদুঘরে তুলে ধরা হয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানে নরওয়েজিয়ান, ফিনিশ ও রুশ জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ ও মেলামেশা হয়েছে।
পাসভিক নদীর পাশে সীমান্তরেখা এক জায়গায় পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়েছে। সেখানে পড়ে গেছে বরিস গ্লেব গির্জা। দ্বাদশ শতাব্দীর এই রুশ অর্থোডক্স গির্জাটি প্রায় ২০০ বছর আগে বর্তমান সীমান্ত নির্ধারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
পাহাড়ি পথে হাঁটতে হয় সীমান্তের কাছে
কিরকেনেস বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে পর্যটকদের শহর পেরিয়ে সীমান্ত এলাকার একটি নিরিবিলি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে শুরু হয় পাথুরে পথ ধরে হাঁটা।
ঘন বার্চ ও শঙ্কুযুক্ত বন পেরিয়ে কোথাও কোথাও জলাভূমির পানি মাড়িয়ে এগোতে হয়। প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটার পর সামনে আসে পাথুরে উঁচু এলাকা। সেখান থেকে পথ ধীরে ধীরে উঠে যায় রুসেহোগদার চূড়ার দিকে।
চূড়ায় পৌঁছালে চারপাশে দেখা যায় নির্জন তৃণভূমি, বার্চ বন ও দূরের কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়। কয়েক মিটার দূরেই চোখে পড়ে হলুদ ও লাল সীমান্তচিহ্ন। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুই দেশের সীমান্তের রাজনৈতিক বাস্তবতাও।
রুসেহোগদা থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে স্তরস্কগ সীমান্ত তল্লাশিকেন্দ্র দেখা যায়। নিচের দুটি তল্লাশিকেন্দ্রের দিকে তাকালে ই-১০৫ সড়ক দিয়ে রাশিয়ার দিকে যাওয়া ট্রাকও মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে।
হফম্যানের মতে, অবকাশযাপনের উদ্দেশ্যে সীমান্ত পারাপার আগের তুলনায় কমেছে। এরপরও প্রতিদিন অল্পসংখ্যক যানবাহন এই পথে চলাচল করে।
পর্যটক বাড়লেও স্থানীয়দের আগ্রহ কম
বিবিসিকে হফম্যান বলেন, সীমান্তের হাঁটার পথগুলোতে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লেও স্থানীয় নরওয়েজিয়ানদের খুব বেশি দেখা যায় না। তাঁর অভিজ্ঞতায়, পর্যটকদের চেয়ে সামরিক টহলই বেশি চোখে পড়ে।
কিরকেনেসের পর্যটন বিভাগের ব্যবস্থাপক আনজা তেল্লেরভো হ্যানসেন বলেন, সীমান্তভ্রমণের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, সীমান্তের এত কাছে বসবাস কীভাবে কিরকেনেস অঞ্চলের জীবন ও পরিচয়কে বছরের পর বছর প্রভাবিত করেছে, এসব ভ্রমণের মাধ্যমে পর্যটকেরা তা বুঝতে পারেন।
রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ার পর সীমান্তকে ঘিরে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। হফম্যানের ভাষ্য, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযান শুরুর পর কিরকেনেসে পর্যটন কিছুটা কমে গেলেও সীমান্ত সম্পর্কে জানার আগ্রহ আবার ভ্রমণের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
সৌন্দর্যের আড়ালে কঠোর নিরাপত্তা
সীমান্ত এলাকায় রাশিয়ার মুঠোফোন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় পথপ্রদর্শকেরা কখনো কখনো মুঠোফোন বন্ধ রাখেন। জরুরি যোগাযোগের জন্য সঙ্গে রাখা হয় উপগ্রহভিত্তিক ফোন।
আন্তর্জাতিক সীমারেখার নির্দিষ্ট চিহ্ন অতিক্রম করা নিষিদ্ধ। সামরিক টহল, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং গাছের মধ্যে থাকা ক্যামেরার কারণে পুরো এলাকাটি সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে থাকে।
তারপরও পর্যটকদের কাছে কিরকেনেসের এই সীমান্তপথ ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজনীতি, যুদ্ধ, সীমান্ত নির্ধারণ ও দুই দেশের সম্পর্ক যে ভূখণ্ডের চেহারা বদলে দিয়েছে, সেটি কাছ থেকে দেখার আগ্রহই এই ভ্রমণের বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
ফলে প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য আর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা একই ভূখণ্ডে পাশাপাশি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন পর্যটকেরা।
সূত্র: বিবিসি

