যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও এক ভৌগোলিক নাম পরিবর্তনের ইস্যুতে আলোড়ন তুলেছেন। এবার তিনি নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তন করে ‘নিউ আমেরিকা’ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি নিউ মেক্সিকোর একটি মানচিত্র পোস্ট করেন, যেখানে ‘মেক্সিকো’ শব্দটির ওপর লাল রঙের বড় ‘X’ চিহ্ন দিয়ে নিচে ‘আমেরিকা’ লেখা ছিল। হোয়াইট হাউসের অফিশিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি পুনরায় পোস্ট করা হলেও, এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ঘটনাটি কিন্তু হঠাৎ করে শুরু হয়নি। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুজব ছড়ায় যে, ট্রাম্প ইতিমধ্যে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তন করে ‘নিউ আমেরিকা’ রেখেছেন। ফ্যাক্ট-চেকিং ওয়েবসাইট স্নোপস জানিয়েছে, এই দাবিটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে রোববার ওই মানচিত্র পোস্ট করেন। সন্ধ্যায় তিনি আরও লেখেন, “অনেক মানুষ নিউ মেক্সিকোর নাম পরিবর্তন করে ‘নিউ আমেরিকা’ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন, যা এই সম্ভাবনাময় অঙ্গরাজ্যের জনগণের জন্য আরও মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দর”।
শুধু নাম পরিবর্তনের ইচ্ছাই নয়, ট্রাম্প ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ভৌগোলিক স্থানের নাম বদলে ফেলেছেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই তিনি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ রাখেন। গত ২৭ আগস্ট তিনি লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার নির্বাহী আদেশে সই করেন; যা কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেই করা হয়। ট্রাম্প ইতিমধ্যে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের ইচ্ছার কথাও প্রকাশ করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—প্রেসিডেন্ট হিসেবে কি ট্রাম্পের সত্যিই অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে? মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্পের হাতে জিওগ্রাফিক নেমস ইনফরমেশন সিস্টেমে (জিএনআইএস) ভৌগোলিক স্থানের নাম, যেমন জলাশয়, পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকলেও, সাংবিধানিকভাবে কোনো অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তনের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। অঙ্গরাজ্যের নাম পরিবর্তন করতে হলে সেই অঙ্গরাজ্যের অভ্যন্তরীণ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
ট্রাম্পের এই পোস্টের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে নিউ মেক্সিকোর রাজনীতিবিদদের মধ্যে। ডেমোক্র্যাট গভর্নর মিশেল লুজান গ্রিশাম এক্সে লেখেন, “নিউ মেক্সিকোর নাম নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই এই নাম আমাদের”। তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প ইরানে তাঁর বিপর্যয়কর যুদ্ধ ও বাড়তে থাকা জ্বালানি মূল্যের মতো বিষয়গুলো থেকে জনগণের মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করছেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্টিন হেইনরিখ বলেন, “তিনটি বিষয় আমি সব সময় তাদের প্রকৃত নামেই ডাকব—মেক্সিকো উপসাগর, লেক অন্টারিও এবং নিউ মেক্সিকো”।
রিপাবলিকান প্রার্থী গ্রেগ হালও এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেছেন, “নিউ মেক্সিকোর নতুন নামের প্রয়োজন নেই। এই রাজ্যে প্রায় পাঁচশ বছর আগে স্প্যানিশ অভিযাত্রী এবং আদিবাসী জাতিগুলোর ইতিহাস রয়েছে”। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দেব হালান্ডও একই সুরে বলেছেন, “নিউ মেক্সিকো নতুন নামকরণের জন্য নয়”। নিউ মেক্সিকোর নামের ইতিহাস ষোড়শ শতাব্দী থেকে, যখন স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা এই অঞ্চলে ‘নুয়েবা মেক্সিকো’ নাম দেন।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ দেখছেন তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে। কিন্তু আইনি বাধা এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রবল বিরোধিতার কারণে ‘নিউ আমেরিকা’ নামটি বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবুও, ট্রাম্পের এই ‘নামকরণের খেলা’উপসাগর থেকে হ্রদ, তারপর অঙ্গরাজ্য আমেরিকার ভৌগোলিক নামকরণের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করল। আগামী দিনে তিনি কি সত্যিই আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবেন? নাকি এটি আরেকটি মনোযোগ সরানোর কৌশল? সময়ই বলে দেবে।

