ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস, খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস আর ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি মিতালী এক্সপ্রেস; এই তিনটি ট্রেনের যাত্রা থেমে গিয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অস্থির সময়ে। সেই যাত্রা আবার শুরু করতে ঢাকায় বসেছে বাংলাদেশ ও ভারতের রেল কর্মকর্তাদের বার্ষিক বৈঠক। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রেল ভবনে শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই আন্তঃসরকারি রেল বৈঠকে (আইজিআরএম) শুধু পুরোনো ট্রেনগুলো চালু করাই নয়, নতুন রুট ও আধুনিকায়নের প্রস্তাবও উঠে আসছে।
বাংলাদেশের পক্ষে ১৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল নেতৃত্ব দিচ্ছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হক। অন্যদিকে ভারতীয় রেলের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত সদস্য দীপক কুমার ঝা নেতৃত্বে ৯ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে। এই বৈঠকে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত রয়েছেন।
সবচেয়ে বড় আলোচনা হচ্ছে, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বন্ধ হয়ে যাওয়া তিনটি আন্তর্জাতিক ট্রেন পরিষেবা। মৈত্রী এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে কলকাতা, বন্ধন এক্সপ্রেস খুলনা থেকে কলকাতা এবং মিতালী এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি রুটে চলাচল করত। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের কারণে এই ট্রেনগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তীকালে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরও তা পুনরায় চালু হয়নি। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে মালবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হলেও যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো এখনও বন্ধ রয়েছে।
বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষ একটি নতুন প্রস্তাবও তুলছে; রাজশাহী থেকে কলকাতা পর্যন্ত নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করা। পাশাপাশি ঢাকা-কলকাতা মৈত্রী এক্সপ্রেসকে যমুনা সেতুর পরিবর্তে পদ্মা সেতুর মাধ্যমে পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতুপথে ট্রেন চলাচল করলে সময় ও দূরত্ব উভয়ই কমবে, যা যাত্রীদের জন্য বাড়তি সুবিধা বয়ে আনবে।
বাংলাদেশ রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নজমুল ইসলাম জানিয়েছেন, এই বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ট্রেন কবে চালু হবে বা কোনগুলো চালু হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, উভয় দেশের মধ্যে সম্মতি হলে আগামী মাসেই ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু হতে পারে। তবে রেল কর্তৃপক্ষের সম্মতির পাশাপাশি উভয় দেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও প্রয়োজন।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে কিছু টানাপোড়েন ছিল। বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং বাংলাদেশের তার প্রত্যর্পণ অনুরোধ; এই ইস্যুগুলো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবং ভারত বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা দেওয়া পুনরায় শুরু করায়, সম্পর্কের উন্নতির পথ তৈরি হয়েছে। এই বৈঠকও সেই প্রচেষ্টারই অংশ।
ঢাকা-কলকাতা রেল যোগাযোগের ইতিহাস ২০০৮ সালের মৈত্রী এক্সপ্রেস দিয়ে শুরু। দীর্ঘ বিরতির পর আবার সেই যোগাযোগ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন রাজশাহী-কলকাতা রুট এবং পদ্মা সেতুপথে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালানোর প্রস্তাব; দুই দেশের রেল যোগাযোগকে আরও সম্প্রসারিত করবে। তবে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নির্ভর করবে দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। আগামী কয়েকদিনের আলোচনাই সেটা স্পষ্ট করবে।

