লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের এক শান্ত পাড়া। বিকেলের নরম রোদ পড়েছে বাগানে, একটি সাদা কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে অলসভাবে। ভেতরের রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ফোনে ব্যস্ত চলচ্চিত্র প্রযোজক জেমিমা গোল্ডস্মিথ। বাইরে থেকে দৃশ্যটা শান্ত মনে হলেও, এই বাড়ির ভেতরে বাস করছে গভীর উদ্বেগ আর মানসিক যন্ত্রণা। এটি জেমিমা গোল্ডস্মিথ ও পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের দুই ছেলে—কাসিম ও সুলাইমান খানের বাসভবন।
লন্ডনের এই স্নিগ্ধ বিকেলেও দুই ভাইয়ের চিন্তা আটকে আছে হাজার হাজার মাইল দূরে, রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারের একটি সংকীর্ণ কক্ষে, যেখানে বন্দী তাদের বাবা। তেয়াত্তর বছর বয়সী সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি রক্ত জমাট বাঁধার কারণে প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানা যায়, আর সেখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়াও কঠিন।
ব্রিটেনের সঙ্গে ইমরান খানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের—অক্সফোর্ডে পড়াশোনা থেকে শুরু করে কাউন্টি ক্রিকেট খেলা, সবকিছুতেই তার ছাপ স্পষ্ট। এ কারণে তার বন্দিদশা নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ওপর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সম্প্রতি লর্ডসে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের প্রথম দিনে অস্বাভাবিক এক ঘটনা ঘটে যায়—ইমরান খানের দুই ছেলের একটি সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হওয়া নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে পাকিস্তান দল দুপুরের বিরতির পর মাঠে নামতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে সাতাশ বছর বয়সী ছোট ছেলে কাসিম মন্তব্য করেন, দলটি নিজেদের হাস্যকর অবস্থানে ফেলেছে। বড় ভাই ঊনত্রিশ বছর বয়সী সুলাইমানের কণ্ঠে ছিল একধরনের ক্লান্ত হতাশা—তার ভাষ্য, প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিত হলেও মাঠে না নামার হুমকি দেওয়াটা ছিল অপ্রত্যাশিত বাড়াবাড়ি। তার মতে, একজন সাবেক খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার সরিয়ে ফেলার এখতিয়ার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের থাকা উচিত নয়, কারণ বিষয়টি রাজনীতির নয়, বরং মানবাধিকার ও স্বাস্থ্যের।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগে সতেরো বছরের সাজাপ্রাপ্ত ইমরান খানের ওপর নির্যাতনের মাত্রাও যেন বেড়েই চলেছে। যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছে, তা সাধারণত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত বলে অভিযোগ। পানির মান এতটাই নিম্ন যে অসংখ্য সহবন্দী হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়। তাকে শুধু কোরআন পড়তে দেওয়া হয়, অন্য কোনো বই নয়, আর দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই কাটাতে হয় একাকী বন্দিত্বে—অথচ জাতিসংঘের নিজস্ব নিয়মেই বলা আছে, টানা পনেরো দিনের বেশি এমন একাকী বন্দিত্ব নির্যাতনের শামিল।
কাসিমের স্পষ্ট অভিযোগ, সরকার আসলে তাকে কারাগারের ভেতরেই নিঃশব্দে শেষ করে দিতে চায়, যাতে মানুষ ধীরে ধীরে ভুলে যায়। তবে তিনি মনে করেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে এটা সহজ নয়, তাই সরকার সময় ক্ষেপণ করে ধীরে ধীরে কঠোরতা বাড়িয়ে তার বেঁচে থাকা কঠিন করে তোলার কৌশল নিচ্ছে বলে তার ধারণা।
সুলাইমান আরও উদ্বেগজনক একটি আশঙ্কার কথা জানান—তার ভাষ্যে, সরকার হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ধাপে ধাপে বাবার স্বাস্থ্যের অবনতির খবর প্রকাশ করছে, যাতে সাহায্য করার ভান বজায় রেখে আসলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা যায়, যেখানে ভবিষ্যতে মৃত্যু ঘটলেও দায় এড়ানো যায়।
ব্রিটিশ সরকারের সহায়তা প্রসঙ্গে কাসিম জানান, সাহায্য পাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তাদের সরাসরি বলা হয়েছিল বাবার সঙ্গে দেখা করতে না যেতে—এমনকি পাকিস্তানে গিয়ে আটক হলেও কোনো সহায়তা মিলবে না বলে জানানো হয়। গত বছর পদত্যাগ করা যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি বিষয়টিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিচারিক প্রক্রিয়া বলে এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
সুলাইমান এ নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন। তার মতে, জাতিসংঘ যেখানে স্পষ্টভাবে অবৈধ আটক ও নির্যাতনের কথা বলেছে, সেখানে ব্রিটিশ সরকার আরও চাপ প্রয়োগ করতে পারত। এই অভিজ্ঞতা তার আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে ধারণাই বদলে দিয়েছে বলে তিনি জানান—দেশগুলো শুধু নিজের স্বার্থ দেখে, সত্য বা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে আগ্রহী নয় বলে তার অভিজ্ঞতা।
পাকিস্তান সরকারের ভাষ্য অবশ্য ভিন্ন। তাদের দাবি, প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ছেলেরা চাইলে বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারেন। কিন্তু জেমিমা গোল্ডস্মিথ এই যুক্তিকে একটি ফাঁদ বলে মনে করেন—তার আশঙ্কা, পাকিস্তানে পা রাখামাত্রই ছেলেদের গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে।
ভিসার জন্য আবেদন করেও কোনো সদুত্তর মেলেনি বলে জানান দুই ভাই। স্বাভাবিকভাবে দশ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়ার কথা থাকলেও কোনো কারণ ছাড়াই বারবার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এখন তারা যুক্তরাজ্যের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের চেষ্টা করছেন বলে জানান কাসিম।
পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি হাসপাতালে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ইমরানের পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথা থাকলেও, বাস্তবে তাকে সরকারি এক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষার পর ফের কারাগারে ফিরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন দুই ছেলে। কাসিমের ভাষায় পুরো ঘটনাটি একটি সন্দেহজনক নাটক, যেখানে হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রস্তুত থাকলেও শেষ মুহূর্তে সবকিছু বাতিল করা হয়। সুলাইমানও একে চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল বলে অভিহিত করেন।
এদিকে ছেলেদের এই প্রকাশ্য বক্তব্যে পাকিস্তান সরকারের অস্বস্তি বাড়ছে বলেই মনে হয়। দেশটির প্রেসিডেন্ট, যিনি এর আগে ইমরানকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরামর্শ দিয়েছিলেন, তার সরকারের ভাষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন—তাদের দাবি, ইমরান একটি বিশাল প্রাঙ্গণে আছেন, যেখানে ব্যায়ামের সরঞ্জাম, রান্না করা খাবার ও টেলিভিশন দেখার সুযোগ রয়েছে, এমনকি নয়শর বেশি মানুষ তার সঙ্গে দেখা করেছেন বলেও দাবি করা হয়। তবে এসব দাবির স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই বলে মনে করিয়ে দেন দুই ভাই—বাস্তবতা হলো, গত তিন বছরে তারা বাবাকে চোখে দেখেননি, আর চলতি বছরের মার্চের পর কোনো ফোনকলও হয়নি।
পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রতি দুই ভাইয়ের তীব্র অসন্তোষ রয়েছে, কারণ তাদের মতে বোর্ড আর সরকারের মধ্যে এখন আর কোনো ফারাক নেই—বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান একই সঙ্গে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। কাসিম হাসতে হাসতে মন্তব্য করেন, বাবাকে নিয়ে সামান্য আলোচনা হলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, আর সেই আতঙ্ক থেকেই তারা একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নেয়।
এই প্রসঙ্গে ২০২৩ সালের একটি ঘটনার কথাও উঠে আসে—দেশের ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে তৈরি একটি প্রচারণামূলক ভিডিওতে ১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের একাধিক মুহূর্ত দেখানো হলেও সেই দলের অধিনায়ক ইমরান খানকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে এই ইস্যুতে নীরব থাকেননি ক্রীড়াঙ্গনের অনেকে। অস্ট্রেলিয়ার একজন সাবেক টেস্ট অধিনায়ক ইমরানের অবিলম্বে চিকিৎসার দাবি জানিয়েছেন, বলেছেন যে কোনো মানুষের প্রাপ্য ন্যূনতম মর্যাদা তার প্রতিও দেখানো উচিত। ইমরানের সাবেক সতীর্থ জাভেদ মিয়াঁদাদও এক সাক্ষাৎকারে গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, তার সঙ্গে এমন আচরণ মোটেও ঠিক নয়।
দুই ভাইয়ের এই লড়াইয়ের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক ব্যক্তিগত শূন্যতাও। তারা শুধু চান বাবার সঙ্গে সাধারণ একটা কথোপকথন, কোনো নজরদারি ছাড়াই। মার্চের আগে পর্যন্ত অজ্ঞাত এক নম্বর থেকে সংক্ষিপ্ত ফোনকল পেতেন তারা, যা এখন পুরোপুরি বন্ধ। কাসিমের আক্ষেপ, এত সংক্ষিপ্ত সময়ে গত এক বছরের জীবনের কথা বলাই যায় না, ফলে তারা বড় হয়ে কেমন মানুষ হয়েছেন, তা বাবার অজানাই থেকে যাচ্ছে।
কাসিম একজন ডিজিটাল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের একটি অনলাইন মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন, আর সুলাইমান রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর বছরের একটা অংশ তারা লন্ডনে মায়ের কাছে, বাকিটা পাকিস্তানে বাবার কাছে কাটাতেন। পাহাড়ি এলাকায় হাইকিং, ক্রিকেট-টেনিস খেলা আর সন্ধ্যায় একসঙ্গে সিনেমা দেখার স্মৃতিই তাদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান বলে জানান দুই ভাই।
রাজনীতিতে বাবার প্রবেশ নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে সুলাইমান জানান, শুরুতে তিনি দারুণ উচ্ছ্বসিত ছিলেন, ভেবেছিলেন বাবা সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। কিন্তু তখন তিনি বুঝতে পারেননি সেনাবাহিনীর প্রভাব কতটা নির্ণায়ক—ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তাদের উদ্বেগ শুরু হয়, আর ২০২২ সালের প্রাণনাশের চেষ্টা সেই ভয়কে আরও দৃঢ় করে তোলে। পাকিস্তানের ঊনআশি বছরের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীই পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি—এই তথ্যও তাদের উদ্বেগের একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে আসে।
সব মিলিয়ে, আইনি ও রাজনৈতিক এই লড়াইয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক গভীর পারিবারিক যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তার গল্পই বলে গেলেন ইমরান খানের দুই ছেলে—যারা এখনো অপেক্ষায় আছেন, আবার কবে বাবার সঙ্গে দেখা হবে, তার উত্তর না জেনেই।

