ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার অংশ হিসেবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মঙ্গলবার দুই নেতার মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টা ফোনে আলোচনা হয়। পুতিনের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ আলোচনাটিকে ‘গঠনমূলক ও বেশ খোলামেলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
উশাকভের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনালাপে ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পরিকল্পনা নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেন পুতিন।
রুশ প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির একটি ‘বস্তুনিষ্ঠ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ’ তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান উশাকভ। একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে সম্ভাব্য অগ্রগতি এবং রাশিয়ার ঘোষিত সামরিক লক্ষ্য ও কার্যক্রম কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গিও ট্রাম্পকে জানানো হয়।
রাশিয়া ভবিষ্যতে ইউরোপের কোনো দেশ এমনকি ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্রেও হামলা চালাতে পারে—এমন উদ্বেগও আলোচনায় এসেছে বলে জানান উশাকভ।
তবে পুতিন এই আশঙ্কা প্রত্যাখ্যান করেছেন। উশাকভ বলেন, আলোচনায় স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে ইউরোপের বিরুদ্ধে রাশিয়ার কোনো আগ্রাসী পরিকল্পনা নেই।
ফোনালাপ নিয়ে মন্তব্য জানতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কাছে আল জাজিরা জানতে চাইলেও হোয়াইট হাউস কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই সংঘাতের অবসানে ট্রাম্পের ভাষায় ‘যুদ্ধ শেষ করার একটি প্রস্তাব’ নিয়ে আলোচনা করতে পুতিন ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে পৃথক বৈঠক করার কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প-পুতিনের এই ফোনালাপ হলো।
উশাকভ সাংবাদিকদের জানান, দুই নেতা তাঁদের সাম্প্রতিক সফর ও বৈঠকের ফলাফল নিয়ে মতবিনিময় করেছেন। আলোচনায় কিছু ‘খুব ভালো ও মূল্যবান ধারণা’ও উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
রোববার মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে জেলেনস্কি তাঁদের ইউক্রেনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। যুদ্ধ চলমান থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রতিনিধিদল কিয়েভ সফর করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জেলেনস্কি বলেন, প্রতিনিধিদলের ইউক্রেনে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি জানান, স্টিভ ও জ্যারেড, উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে বৈঠকের জন্য তাঁরা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করছিলেন।
যুদ্ধের অবসানে সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া ইউক্রেনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সব পক্ষের ইতিবাচক বক্তব্যের পরও এসব বৈঠক যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি। সপ্তাহান্তে স্বল্প সময়ের জন্য যুদ্ধবিরতি থাকার পর রাশিয়া ও ইউক্রেন আবারও হামলা শুরু করে।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, মঙ্গলবার সকালে কিয়েভে রাশিয়ার হামলায় অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ২৫ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে রুশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্রায়ানস্ক ও কুরস্ক অঞ্চলে হামলায় তিনজন নিহত ও আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন।
রাশিয়ার অধিভুক্ত ক্রিমিয়াতেও ইউক্রেনের হামলায় প্রায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করার পর বর্তমান যুদ্ধের সূচনা হয়। ইউক্রেনকে ইউরোপের অন্যতম প্রধান শস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে এই যুদ্ধের অবসানকে তুলে ধরেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি দাবি করেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেন যুদ্ধের নিষ্পত্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।
পরে অবশ্য সেই বক্তব্য থেকে সরে এসে তিনি একে অতিরঞ্জিত দাবি হিসেবে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার খবরের মধ্যেও ট্রাম্প বারবার ইউক্রেনের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ ও অর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তবে সমালোচকদের কেউ কেউ এর প্রধান কারণ হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন।
ইউক্রেন ও দেশটির প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেলেও পুতিনের সঙ্গে তিনি তুলনামূলকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
ট্রাম্প নিজেও বলেছেন, পুতিনের সঙ্গে তাঁরা একসঙ্গে ‘অনেক কঠিন সময়’ পার করেছেন।
গত বছর ট্রাম্প পুতিনকে আলাস্কায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। ২০১৫ সালের পর সেটিই ছিল পুতিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর।
ইউক্রেনের যুদ্ধ অবসানের প্রচেষ্টায় ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের যথেষ্টভাবে সম্পৃক্ত না করায় ট্রাম্প প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় দেশটির নেতৃত্ব এবং ইউরোপীয় মিত্রদের আরও সরাসরি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
এদিকে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসের শেষ দিকে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠক যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের প্রচেষ্টায় নতুন কোনো অগ্রগতি আনে কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।

