মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানীতে বুধবার বিক্ষোভে নেমেছেন কয়েক ডজন নাগরিক। তাঁরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে যেন কোনো সেনা না পাঠানো হয়।
সিউলে মার্কিন দূতাবাসের সামনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন, যাতে লেখা ছিল আগ্রাসী যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার আহ্বান। বার্তা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী এই বিক্ষোভে প্রায় ষাট জন অংশগ্রহণ করেন।
এই বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সহযোগিতার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন। এই যুদ্ধের মধ্যেই বৈশ্বিক তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান। বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, তাঁরা নিজেদের তরুণ প্রজন্মকে এমন এক যুদ্ধে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারেন না যার সঙ্গে তাঁদের দেশের সরাসরি সম্পর্ক নেই।
হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি তথ্য অনুসন্ধানকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দেওয়ার এক দিন পরই এই বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ভাষ্য হলো, সেনা পাঠানোর ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে গত শুক্রবার দেশটি জানিয়েছিল, নিজেদের সামরিক প্রস্তুতিতে সমস্যা না হলে হরমুজে মার্কিন নিরাপত্তা কার্যক্রমে সহযোগিতার বিষয়টি তারা বিবেচনায় রাখছে।
এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইরান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরানের ভাষ্য, দক্ষিণ কোরিয়া সেখানে সেনা পাঠালে তা যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনে সরাসরি সমর্থন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর গুরুতর পরিণতি হতে পারে। একটি নাগরিক সংগঠনের একজন সদস্য এই অবস্থানের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, হরমুজে সেনা পাঠানো মানে একটি অবৈধ যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইরানের ওপর মার্কিন হামলায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, যার মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঘটনাও রয়েছে।
প্রায় ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করে। এরপর থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিত্র দেশগুলোর সহায়তা আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে আসছেন, তবে যুদ্ধের বাস্তব পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে, যে জলপথ দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করত। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধও আরও কঠোর করেছে।
আরেকটি নাগরিক সংগঠনের একজন সদস্য সতর্ক করে বলেন, হরমুজে দক্ষিণ কোরীয় সেনা পাঠানো হলে হতাহতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এবং যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত একটি অবৈধ যুদ্ধে তাঁদের সেনাদের সম্পৃক্ত করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি এ-ও বলেন, অন্য কোনো দেশ এখনও সেখানে সেনা পাঠায়নি বা পাঠানোর ঘোষণাও দেয়নি, তাই দক্ষিণ কোরিয়ার এককভাবে এই পথে এগোনোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।
উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়া যদি শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের জন্য দেশটির জাতীয় সংসদের অনুমোদন লাগবে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে সম্পৃক্ততা নিয়ে জনমতের একটি স্পষ্ট বিভাজন তুলে ধরছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘায়িত হলে দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিক—দুই দিক থেকেই চাপ আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

