যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে আসছে। লক্ষ্য একটাই—দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে চাপে ফেলা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বাধা এবং সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ইরান এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
বরং গত এক দশকের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ইরান এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা বড় ধরনের চাপের মধ্যেও কোনো না কোনোভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হচ্ছে।
২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযানের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৈশ্বিক আর্থিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে এবং দেশটির অর্থনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করাই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। এর আগে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে নেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের নীতি, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছিল। এরও আগে ২০১২ সালে বারাক ওবামা প্রশাসন ইরানের ওপর আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছিল।
তবে এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা চাপ ইরানের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করতে পারেনি।
নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠান আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে পিছিয়ে পড়েছে। একসময় দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা ইরানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানও আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে।
কিন্তু ইরানের অর্থনৈতিক টিকে থাকার মূল রহস্য হলো—দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কৌশল তৈরি করেছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান বিভিন্ন উপায়ে তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে পেরেছে। বিশেষ করে চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির অ-তেলভিত্তিক শিল্পও নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ায় বিদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা কমেছে এবং স্থানীয় উৎপাদকরা আঞ্চলিক বাজারে কিছু সুযোগ পেয়েছে।
এই কারণে ইরানের অর্থনীতি সিরিয়া বা ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত ধসে পড়েনি।
তবে বর্তমান পরিস্থিতি আগের তুলনায় কঠিন। কারণ এবার শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, সামরিক সংঘাতও ইরানের অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প স্থাপনা, বিশেষ করে ইস্পাত ও রাসায়নিক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর নৌ চলাচল কমে যাওয়ায় আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ইরানের মোট দেশজ উৎপাদন ৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমতে পারে। এর আগে এক বছরের সময়ে সংকোচনের হার ছিল এর চেয়ে অর্ধেকেরও কম। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের শুরুতে বেড়ে ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। দেশটির মুদ্রার মূল্যও ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে এক ডলারের বিপরীতে দুই মিলিয়নের বেশি রিয়াল প্রয়োজন হচ্ছে।
তারপরও ইরানের সরকার এখনো যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এর একটি বড় কারণ হলো বহু বছরের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা।
ইরান আগে থেকেই বিভিন্ন পণ্যের মজুত বাড়িয়ে রেখেছে। ফলে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলেও দেশটি তাৎক্ষণিক সংকটে পড়ছে না। একই সঙ্গে সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতির বড় অংশ সাধারণ জনগণ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুললেও তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে দিতে পারছে না।
ইরানের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিজেরাও অর্থনৈতিক সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। ২১ আগস্ট ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, সামরিক শক্তি যতই থাকুক, জনগণ ক্ষুধার্ত থাকলে এবং অর্থনৈতিক প্রবাহ ও উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল হলে দেশ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও স্বীকার করেছেন যে নিষেধাজ্ঞা দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
তবে এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। বরং বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অর্থনৈতিক কাঠামো এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যেখানে সংকটের বড় অংশ সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে পড়ছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূল অংশ এখনো কার্যকর রয়েছে।
বিশ্লেষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, শুধু প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রার মান দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিচার করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। একটি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সংকট মোকাবিলা করছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে টিকে আছে এবং জনগণ কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের কৌশলের পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলায় বড় সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে শিল্প উৎপাদন ও সামরিক অর্থনীতি শক্তিশালী করার পথ নিয়েছিল। অন্যদিকে ইরান ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সক্ষমতা, সীমিত আমদানি এবং কম খরচের অর্থনীতির মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করেছে।
ইরানের এই নীতির ফলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের দুর্বলতা মানুষের জীবনকে কঠিন করেছে। কিন্তু একই সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিজেদের প্রয়োজনীয় সম্পদ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের শিল্প খাতও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি বিভিন্ন সংকটে সংকুচিত হলেও অ-তেল শিল্প কিছুটা স্থিতিশীল ছিল। ২০২৪ সালের শুরুতে বাস্তব আয় প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ার কারণে অর্থনীতিতে সাময়িক উন্নতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। তবে পরবর্তী সামরিক উত্তেজনা সেই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে।
ইরানি প্রতিষ্ঠানগুলোর আরেকটি বড় শক্তি হলো পণ্যের মজুত ব্যবস্থাপনা। বহু বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতার কারণে তারা কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় পণ্যের বড় মজুত ধরে রাখে। তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে গড়ে প্রায় তিন মাসের পণ্য মজুত থাকে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই মজুত ২০০ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরানের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে। সাধারণ মানুষের ভোগ কমেছে, পণ্যের দাম বেড়েছে এবং অনেক পরিবার ঋণের ওপর নির্ভর করছে। খাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের বিক্রিও কমে গেছে।
সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণে বড় পদক্ষেপ নেয়নি এবং মূল্যস্ফীতিকে এক ধরনের প্রয়োজনীয় ক্ষতি হিসেবে মেনে নিয়েছে, যাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় ও অন্যান্য অগ্রাধিকার চালিয়ে যাওয়া যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি যেখানে অর্থনীতি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে।
ইরানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমদানির ওপর নির্ভরতা। চলতি ইরানি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটির আমদানি ব্যয় ছিল ১৭ বিলিয়ন ডলার। ধারণা করা হচ্ছে, বছরের শেষে মোট আমদানি প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা আগের বছরের ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং তার আগের বছরের ৭২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় অনেক কম।
সব মিলিয়ে, ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত ধসে পড়ার পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। কারণ ইরান দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ ইরানের জনগণের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করতে হলে শুধু নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে অনেকটা সীমিত শক্তিতে চললেও দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো এখনো টিকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে পুরোপুরি দুর্বল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অর্থনীতির ওপর নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে হবে।

