এবার তীব্র গরমের মধ্য দিয়ে পুরো গ্রীষ্মকাল পার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেখা দিয়েছে, যার প্রভাবে বিভিন্ন এলাকায় খরার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) গতকাল বুধবার জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৭৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
এই তাপমাত্রা পুরো ২০ শতকের গড় তাপমাত্রার তুলনায় ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি। এর আগে ১৯৩৬ ও ২০২১ সালের গ্রীষ্মকালে যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল। তবে এবারের গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে। আগের রেকর্ডের তুলনায় এবার তাপমাত্রা শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বেশি ছিল।
আগস্ট মাস পশ্চিম ইউরোপের জন্যও সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্মের মাসগুলোর একটি ছিল। এবারের তীব্র গরম সেখানে ২০০৩ সালের প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এনওএএ গত ১৩২ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়ার তথ্য সংরক্ষণ করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কোনো গ্রীষ্মকালে এবারকার মতো এত বেশি তাপমাত্রা দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে গত আগস্ট ছিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস। ওই মাসে দেশটির গড় তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৭৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড তাপমাত্রার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এনওএএর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পাঁচটি উষ্ণতম গ্রীষ্মের মধ্যে চারটিই ঘটেছে গত পাঁচ বছরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে তাপমাত্রা বৃদ্ধিও এই বৃহত্তর জলবায়ু পরিবর্তনের অংশ।
১৯৩৬ সালের রেকর্ড তাপমাত্রার সময় গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলে তীব্র গরম ও খরার পাশাপাশি ক্ষতিকর কৃষিপদ্ধতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। তবে এবারের গ্রীষ্মে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শুষ্ক আবহাওয়ার প্রবণতাও আরও তীব্র হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের প্রায় ৫৯ শতাংশ এলাকা খরার আওতায় ছিল। এক মাসের ব্যবধানে খরাকবলিত এলাকার পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গ্রেট প্লেইনস, মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
টেক্সাস ও ওকলাহোমায় গত আগস্টে স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০ শতাংশেরও কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব অঞ্চলের পরিস্থিতি একই রকম ছিল না। ইন্ডিয়ানা ও ওহাইওর মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গত আগস্টে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। এসব এলাকায় স্বাভাবিকের প্রায় দ্বিগুণ বৃষ্টি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে তাপপ্রবাহের তীব্রতা এখনই কমার সম্ভাবনা নেই। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, এল নিনো পরিস্থিতি আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী হচ্ছে। এটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এর প্রভাব ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত থাকতে পারে।
ডব্লিউএমওর প্রধান সেলেস্তে সাওলো গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের বলেন, “বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, এটি আমাদের পর্যবেক্ষণ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে। অর্থাৎ চার দশক ধরে আমরা যে মাত্রা দিয়ে এটি পরিমাপ করে আসছি, এবার আক্ষরিক অর্থেই সেই মাত্রার বাইরে চলে যেতে পারে।”
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। এর মধ্যে এল নিনো পরিস্থিতি বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ডব্লিউএমও সতর্ক করে জানিয়েছে, বর্তমান এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা এবং বন্যার মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
এনওএএ জানিয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বরেও যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা থাকতে পারে। সংস্থাটি আরও বলেছে, দেশটির কয়েকটি অঞ্চলে খরা অব্যাহত থাকতে পারে অথবা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
এনওএএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম, মধ্য-পশ্চিম এবং দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে বড় ধরনের দাবানলের ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকবে।

