জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচলাবস্থায় থাকলেও এই বৈশ্বিক সংস্থাটি একেবারে ভেঙে পড়েনি বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার একটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
গুতেরেস তার বক্তব্যে বলেন, বর্তমান বিশ্বে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গভীর ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, অথচ এসব দেশ এখনো নিজেদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে পারেনি। তার মতে, এই বিভাজনের কারণেই মধ্যম শক্তিধর দেশগুলো কোনো আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে একধরনের দায়মুক্তির সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, শক্তিধর দেশগুলোর এই পারস্পরিক বিভাজনের কারণেই নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যা বিশ্বকে ক্রমেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের নিরলস প্রচেষ্টার কারণেই এখন পর্যন্ত একটি সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালিসহ বিভিন্ন কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, কৃষ্ণসাগর, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তার ভাষায়, কোনো একটি পক্ষকে সুবিধা দিয়ে অন্য পক্ষকে বঞ্চিত করার নীতি কাম্য নয়। খাদ্য ও সার পরিবহনে যেকোনো ধরনের অবরোধ ঠেকাতে জাতিসংঘ বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন, অতীতে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনের একটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহনের একটি প্রস্তাব ইরানকে দেওয়া হলেও তারা তা গ্রহণ করেনি বলে জানান তিনি। কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেন ও রাশিয়ার খাদ্য, সার ও জ্বালানি পণ্য রপ্তানির বিষয় নিয়েও আলোচনায় আগ্রহী জাতিসংঘ, তবে এ ধরনের উদ্যোগ সফল করতে প্রয়োজন যথাযথ রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এমনটাই মনে করেন তিনি।
ব্রিকস সম্মেলনে ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে তাদের সঙ্গে এসব বিষয়ে সরাসরি আলোচনা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস জানান, তিনি সম্মেলনে উপস্থিত প্রায় সব পক্ষের সঙ্গেই কথা বলেছেন। তার দৃঢ় অভিমত, শক্তিধর দেশগুলোর জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো নিজেদের মধ্যকার বিভাজন কাটিয়ে ওঠা এবং নিজেদের ক্ষমতার প্রকৃত সীমারেখা সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধিতে পৌঁছানো।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ মহাসচিবের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে। শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা কীভাবে বৈশ্বিক শান্তি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলছে, তারই একটি স্পষ্ট প্রতিফলন উঠে এসেছে তার এই বক্তব্যে।

