য়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে হুথিদের প্রভাব বৃদ্ধি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই অবস্থান ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতে আরও বড় কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাব আল-মান্দেব প্রণালী শুধুমাত্র একটি সামুদ্রিক পথ নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। এই প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে চলাচলকারী অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে সুয়েজ খালের দিকে যায়।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এই পথের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই এই অঞ্চলে কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণ বা সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি হলে তা শুধু স্থানীয় রাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল এবং আশপাশের দ্বীপগুলোতে হুথিদের অবস্থান তাদের সামুদ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। আগে কোনো জাহাজে হামলার জন্য তাদের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এখন উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান থেকে তারা তুলনামূলক কম দূরত্বের অস্ত্র বা অন্যান্য পদ্ধতি ব্যবহার করে জাহাজ চলাচলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এর ফলে বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে আরও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি বহনকারী জাহাজ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য এই পরিস্থিতি উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
হুথিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। যদিও হুথিরা নিজেদের স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে, তবুও তাদের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে হুথিদের প্রভাব বৃদ্ধি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর অতিরিক্ত কৌশলগত চাপ প্রয়োগের সুযোগ দিতে পারে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ—হরমুজ প্রণালী এবং বাব আল-মান্দেব—দুটির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যিক নৌ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলা সম্ভব।
এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক “হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে বাড়তি সুবিধা” হিসেবে দেখছেন। কারণ হরমুজ প্রণালী ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। এর সঙ্গে বাব আল-মান্দেবের ওপর প্রভাব যুক্ত হলে ইরানের আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকাংশেই নিরাপদ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। বাব আল-মান্দেব অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে জাহাজ চলাচলের খরচ বাড়তে পারে, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
কোনো দেশ সরাসরি এই পথ বন্ধ না করলেও, নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করাই বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ তৈরির সুযোগ পেতে পারে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথগুলোর নিরাপত্তাকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। বাব আল-মান্দেব এলাকায় হুথিদের প্রভাব বৃদ্ধি ওয়াশিংটনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
কারণ, এই অঞ্চলে কোনো ধরনের হুমকি শুধু একটি দেশের নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হতে পারে।
তবে হুথি নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য নিজেদের হুমকি হিসেবে দেখানোর বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিরাপদ থাকবে।
তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্ধ করতে চায় না। তবে তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবকে ঘিরে পরিস্থিতি আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। হুথিদের অবস্থান যত শক্তিশালী হবে, ইরান তত বেশি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে।
তবে একই সঙ্গে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ব বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, ছোট একটি সামুদ্রিক পথও কীভাবে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির বড় খেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাব আল-মান্দেব এখন শুধু একটি প্রণালী নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার লড়াইয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

