যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয় কর্মকাণ্ডগুলো ভোটারদের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে প্রচারে নামতে হচ্ছে তাকে। একই সঙ্গে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও নিজের অবস্থান তৈরি করছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনবিষয়ক সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার আগে নিজ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে ভ্যান্স প্রশাসনের জনপ্রিয় অর্জনগুলো ভোটারদের সামনে তুলে ধরার ওপর জোর দেন। তার উদ্বেগ ছিল, সরকারের কিছু সাফল্য যথেষ্ট প্রচার পাচ্ছে না।
তবে এই বার্তা বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন স্বয়ং ট্রাম্প। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের সঙ্গে জোট বাঁধার পর থেকে ভ্যান্স অনেকটা এমন একজন রাজনৈতিক অনুবাদকের ভূমিকা পালন করছেন, যিনি ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক ও অনেক সময় আকস্মিক বক্তব্যের বদলে প্রশাসনের মূল রাজনৈতিক বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
নভেম্বরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াই সামনে রেখে সেই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভ্যান্স ও ট্রাম্প এবার আলাদা আলাদা এলাকায় রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে প্রচার চালাবেন। ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ একজনের ভাষায়, তারা অনেকটা ‘ভাগ করে কাজ’ করার কৌশলে এগোবেন।
২০২৮ নিয়ে বাড়ছে আলোচনা
মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু রিপাবলিকান পার্টির জন্য নয়, ভ্যান্সের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষে তিনিই দলের সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের একজন হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
তবে ভ্যান্স এখনো ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
ডালাসের সম্মেলনে তার বক্তব্যেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সেখানে সমর্থকেরা ‘জেডি! ৪৮!’ স্লোগান দিলে ভ্যান্স বিষয়টি রসিকতার সঙ্গে এড়িয়ে যান। ‘৪৮’ বলতে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পর ভ্যান্সকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখার আকাঙ্ক্ষাকেই বোঝানো হচ্ছিল।
ট্রাম্পের বক্তব্যে উঠে আসা ইরান যুদ্ধ, শুল্কনীতি কিংবা ভোটারদের ৫ হাজার ডলারের চেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মতো বিষয়গুলোতে ভ্যান্স জোর দেননি। বরং তিনি পরিবার, সাধারণ আমেরিকান এবং দেশের মানুষের জন্য ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, তার ওপর গুরুত্ব দেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে থেকেও নিজের পরিচয় তৈরি
ভ্যান্স এখনো ট্রাম্পের অন্যতম ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা এবং তার নীতির অন্যতম জোরালো সমর্থক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নিজের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরির চেষ্টাও স্পষ্ট হয়েছে।
সরকারি কর্মসূচিতে প্রতারণা ঠেকাতে গঠিত একটি বিশেষ টাস্কফোর্সের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্বকে তিনি দেশজুড়ে প্রচারের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে একদিকে সাধারণ ভোটারদের কাছে নিজের পরিচিতি বাড়াচ্ছেন, অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের দাতা ও নেতাদের সঙ্গে সম্পর্কও জোরদার করছেন।
অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও ভ্যান্সের বক্তব্যে ট্রাম্পের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন সুর দেখা যাচ্ছে। যেখানে ট্রাম্প অনেক সময় মানুষের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগকে সরাসরি নাকচ করেন, সেখানে ভ্যান্স ভোটারদের হতাশার কথা স্বীকার করে প্রশাসনের নীতির ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানাচ্ছেন।
তথ্যকেন্দ্র বা ডেটা সেন্টার নিয়েও সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রতি ট্রাম্পের তুলনায় বেশি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
ভ্যান্সের সামনে আরেক নাম রুবিও
তবে ২০২৮ সালের সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে ভ্যান্সের পাশাপাশি আরেকটি নাম বারবার উঠে আসছে—পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
রুবিও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ভ্যান্স প্রার্থী হলে তিনি তাকে সমর্থন করবেন। তারপরও অনেক রক্ষণশীল ভোটার রুবিওকে ট্রাম্প প্রশাসনের দক্ষ ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে দেখছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাও তার মধ্যে দেখছেন।
রিপাবলিকান দলের ভেতরে তাই ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কে বহন করবেন, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করছেন জনগণের ভোটেই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। আবার কেউ চান ট্রাম্প, ভ্যান্স ও রুবিও মিলে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান।
নভেম্বরের ফলই হতে পারে বড় পরীক্ষা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ভ্যান্সের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে। রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে তা ভ্যান্সের জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করবে। অন্যদিকে বড় ধরনের পরাজয় হলে তার ২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থিতার হিসাবও বদলে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ভ্যান্স এখন একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব সামলাচ্ছেন—একদিকে ট্রাম্পের প্রশাসনের বার্তা ভোটারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথ তৈরি করা।
তবে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ট্রাম্প নিজেই। কারণ প্রেসিডেন্ট এখনো ২০২৮ সালের নেতৃত্বের প্রশ্নে কাউকে স্পষ্টভাবে সামনে আনেননি এবং রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার আগ্রহও তার কমেনি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই তাই স্পষ্ট হতে পারে—ভ্যান্স শুধু ট্রাম্পের বার্তাবাহক হিসেবেই থাকবেন, নাকি ধীরে ধীরে রিপাবলিকান পার্টির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার পথে এগিয়ে যাবেন।

