কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্ব এখন এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে। একদিকে এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতের অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও সামরিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, এআই যদি একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে তা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্যই বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাড়ছে।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে এআই আধিপত্যের প্রতিযোগিতায়। প্রশ্ন হচ্ছে, যে প্রযুক্তি নিয়ে এত বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ রয়েছে, সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার বদলে দুই দেশ কেন আরও দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, এআইয়ে চীনের বড় ধরনের অগ্রগতি শুধু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় নয়, সাইবার নিরাপত্তা, গোয়েন্দা কার্যক্রম, সামরিক প্রযুক্তি ও তথ্যযুদ্ধেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অন্যদিকে চীনও এআইকে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখছে না। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এআই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
একসময় এআইয়ের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি, শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ, বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগ এবং তথ্যকেন্দ্রিক অবকাঠামোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক এগিয়ে মনে করা হতো। চীনকে সেই অবস্থানে পৌঁছাতে বাধা দিতে যুক্তরাষ্ট্র উন্নতমানের এআই চিপ রপ্তানির ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধও আরোপ করেছে।
কিন্তু সেই বাধা চীনের অগ্রযাত্রা পুরোপুরি থামাতে পারেনি। বরং চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত কম্পিউটিং সক্ষমতার মধ্যে সফটওয়্যারকে আরও দক্ষ ও কম শক্তিনির্ভর করার দিকে জোর দিয়েছে।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ চীনের ডিপসিক। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিপসিকের একটি মডেল পরীক্ষায় ওপেনএআইয়ের শীর্ষ মডেলের তুলনায় মাত্র ০.৪ শতাংশ পিছিয়ে ছিল। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ এআই মডেলগুলোর সক্ষমতার ব্যবধান আরও কমেছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এআই সূচকেও বলা হয়েছে, এআই মডেলের সক্ষমতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যবধান কার্যত বন্ধ হয়ে এসেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে দুই দেশ সব দিক থেকে সমান অবস্থানে রয়েছে। উন্নত এআই মডেল তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিনিয়োগ, উন্নত অবকাঠামো এবং বৃহৎ তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে এখনো বড় সুবিধা রয়েছে। তাই কে এগিয়ে—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে কোন সূচকে তুলনা করা হচ্ছে তার ওপর।
চীন এআইকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ করেছে। দেশটির ২০২৫ সালের নতুন প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত এবং সরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে এআই অবকাঠামো ও বড় ভাষাভিত্তিক মডেল তৈরির দিকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
চীনের বৃহত্তর লক্ষ্য শুধু এআইয়ে এগিয়ে যাওয়া নয়। ব্যাটারি, রোবট, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিসহ ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পেও বিশ্ব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এআইকে ব্যবহার করতে চায় দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তি কাঠামো দ্রুত বড় পরিসরে অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সুবিধা তৈরি করে। তবে এর বড় দুর্বলতাও রয়েছে।
চীনে এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে প্রযুক্তির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার বদলে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষের উদ্বেগের একটি বড় অংশও মানবজাতির সম্ভাব্য বিলুপ্তি নয়, বরং এআই যেন কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল না করে—সেটিকে ঘিরে।
চীনের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিষয়ক কর্মকর্তার সাম্প্রতিক বক্তব্যেও এমন উদ্বেগের প্রকাশ দেখা গেছে। সেখানে সতর্ক করা হয়েছে, এআইয়ে নিয়ন্ত্রণ হারালে যুক্তরাষ্ট্র সাইবার নিরাপত্তা, গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা তথ্য ও প্রচারণার যুদ্ধে সুবিধা নিতে পারে।
অর্থাৎ একই প্রযুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই দেশই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে, তবে তাদের ভয় ও অগ্রাধিকার এক নয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের একটি অংশ এখন এআইয়ের গতি কিছুটা কমানোর পক্ষে কথা বলছে। তাদের আশঙ্কা, এমন এক পর্যায়ে প্রযুক্তিটি পৌঁছাতে পারে যখন এর নির্মাতারাই আর সেটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ধরনের উদ্যোগকে চীনের হাতে সুবিধা তুলে দেওয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র যদি এআই উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়, তাহলে চীন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
এখানেই মূল দ্বন্দ্বটি সবচেয়ে স্পষ্ট। একদিকে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশকে এগিয়ে যেতে না দেওয়ার জাতীয় নিরাপত্তার চাপ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআই কতটা কম্পিউটিং সক্ষমতায় পৌঁছালে তা সত্যিই মানবজাতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠবে—এ বিষয়ে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট ঐকমত্য নেই।
কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান অধ্যাপক ভিনসেন্ট কনিটজারের মতে, নির্দিষ্ট একটি কম্পিউটিং ক্ষমতায় পৌঁছালেই বিপর্যয় ঘটবে—এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার মতো জ্ঞান এখন কারও হাতে নেই। এমনকি নতুন কোনো কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কৃত হলে বর্তমান সক্ষমতাও হয়তো যথেষ্ট হতে পারে।
তাই শুধু ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রযুক্তিগত সীমারেখার অপেক্ষায় থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত, সেটিও বড় প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রে এআইয়ের জন্য বিপুল তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে এসব প্রকল্প নানা সমস্যার মুখে পড়ছে। শ্রমিকের ঘাটতি, নির্মাণসামগ্রীর সংকট, উন্নত চিপের সীমিত সরবরাহ, অনুমোদন প্রক্রিয়া, বাড়তি সুদের হার এবং স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা—সব মিলিয়ে অনেক প্রকল্প পিছিয়ে যাচ্ছে।
এর ফলে এআই উন্নয়নের গতি সাময়িকভাবে কিছুটা কমতে পারে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো নির্মাণে দেরি হওয়া আর কার্যকর নিরাপত্তা নীতি তৈরি করা এক বিষয় নয়। নির্মাণকাজ ধীর হয়ে যাওয়া সাময়িক সময় দিতে পারে, কিন্তু তা এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়।এই প্রশ্নেই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী ডারিও অ্যামোডেইয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে এআই সক্ষমতায় চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে। তবে প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দ্রুত প্রযুক্তি উন্নয়ন করার দরকার নেই।
তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র যদি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত গতিতে এগোয়, তাহলে এআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সময় পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তিগতভাবে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলে চীনকেও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনায় বসাতে চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই ধারণাকে ভালোভাবে নেয়নি। দেশটির একটি রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র অ্যামোডেইয়ের প্রস্তাবকে পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধের কৌশলের সঙ্গে তুলনা করেছে।
তারপরও দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ চীনেরও আশঙ্কা রয়েছে যে এআই যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা হলেও একটি জায়গায় তাদের স্বার্থ মিলে যেতে পারে—এআই যেন এমন পর্যায়ে না যায়, যাকে কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এআই প্রতিযোগিতাকে অনেকেই স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সঙ্গে তুলনা করছেন। পার্থক্য হলো, পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা সম্পর্কে বিশ্ব অনেক বেশি নিশ্চিত ছিল। এআইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এর সম্ভাব্য সীমা এখনো স্পষ্ট নয়।
যদি যুক্তরাষ্ট্র মনে করে চীন এগিয়ে যাচ্ছে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের গতি কমানোর রাজনৈতিক ইচ্ছা দুর্বল হতে পারে। একইভাবে চীনও যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে যেতে দিতে চাইবে না।
ফলে দুই দেশই যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য দ্রুত এগোতে থাকে, তাহলে এমন একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে যেখানে কেউই নিরাপত্তার স্বার্থে গতি কমাতে রাজি হবে না।
উত্তর ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই আইন বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু চিনের মতে, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সুবিধা দেওয়া থেকে বিরত রাখার যথেষ্ট জাতীয় নিরাপত্তাগত কারণ আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এমন প্রযুক্তি তৈরি না করারও জাতীয় নিরাপত্তাগত কারণ রয়েছে, যার আচরণ, লক্ষ্য কিংবা ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে মানুষ নির্ভরযোগ্যভাবে বুঝতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এই দ্বন্দ্বই হয়তো আগামী দিনের এআই রাজনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনকে হারাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে সব সতর্কতা সরিয়ে দেয়, তাহলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে গতি কমিয়ে দিলে চীন এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে—এমন আশঙ্কাও বাস্তব।
তাই সমাধান সম্ভবত পুরোপুরি থেমে যাওয়া কিংবা লাগামহীনভাবে এগিয়ে যাওয়া—কোনোটিই নয়। বরং দুই দেশের মধ্যে এমন একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে এআইয়ের উন্নয়ন চলবে, কিন্তু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণের নিয়ম থাকবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে এআইয়ে প্রথম হবে, তা নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কে এমন একটি এআই ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে, যা শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি মানুষের নিয়ন্ত্রণেও থাকবে।

