ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য তেলের দাম বাড়লেও তা মেনে নেওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৯ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোর বিষয়টিকে জ্বালানির কম দামের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, মানুষকে যদি কম দামে জ্বালানি পাওয়া এবং ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখার মধ্যে একটি বিষয় বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে অধিকাংশ মানুষ দ্বিতীয় বিষয়টিকেই বেছে নেবে। তাঁর ভাষ্য, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয় এবং তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইরান তা অর্জন করতে পারবে না।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে। তবে এর আগের দিনই ইরানকে নিয়ে তিনি আরও কঠোর অবস্থানের কথা বলেছিলেন। ফলে একদিকে যুদ্ধের অবসানের সম্ভাবনার কথা বলা এবং অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান—দুই ধরনের বার্তাই এখন তাঁর বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোর একটি পড়েছে জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও তেল সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে রয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট তেলের দাম ১০৪ দশমিক ৮৭ ডলারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম টেক্সাস অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ দশমিক ৩০ ডলারে নেমে আসে। তার আগের দিনও উভয় ধরনের তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে ছিল।
তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়াচ্ছে না। পরিবহন, কৃষি, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও এতে বেড়ে যায়। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি ধাপে তার প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে উঠেছে এবং এতে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এর মধ্যেই ট্রাম্প বলছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা গেলে সাময়িকভাবে বেশি তেলের দাম মেনে নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে জ্বালানির দামকে মূল সমস্যা হিসেবে না দেখে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক তেলবাজারের পরিস্থিতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের ওপর নির্ভর করছে না। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো, আঞ্চলিক হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহব্যবস্থা—সবকিছুই তেলের দামে প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাজারকে অস্থির রেখেছে।
১৮ সেপ্টেম্বর চীনের উদ্যোগে ইরান সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হুথিদের হামলা কমাতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হলে তেলের দাম কিছুটা কমে। কিন্তু বাজারের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। কারণ হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন চলবে, সেটিও স্পষ্ট নয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার আরেকটি দিক হলো বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি। তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামেও পড়তে পারে। ইতোমধ্যে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ সামলাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে সতর্ক হচ্ছে।
ট্রাম্প অবশ্য মনে করছেন, যুদ্ধ শেষ হলে এই চাপ কমে যাবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘাতের অবসান হলে পেট্রোলের দামও যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু তেলের বাজারে বাস্তবে কত দ্রুত স্বস্তি ফিরবে, তা নির্ভর করছে সংঘাতের অবসান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ অবকাঠামো কত দ্রুত পুনরুদ্ধার হয় তার ওপর।
এর আগে ট্রাম্পও বলেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষের দিকে যেতে পারে। ১৬ সেপ্টেম্বর তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সংঘাতের সমাপ্তি কাছাকাছি। একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল করাকে যুদ্ধের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
তবে যুদ্ধের মেয়াদ ও ফলাফল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বার্তা এলেও দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এর আগে আলোচনার সময়ও পারমাণবিক কর্মসূচি, পরিদর্শন এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য দেখা গেছে।
ফলে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে শুধু তেলের দাম নিয়ে বক্তব্য হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, চলমান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব—সবকিছুর যোগসূত্র।
তেলের দাম বাড়লেও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলে ট্রাম্প মূলত এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয় মেনে নেওয়ার একটি অবস্থান তুলে ধরেছেন। কিন্তু যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তার চাপও তত বেশি সময় ধরে থাকতে পারে। তাই সংঘাতের অবসান এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার বিষয়টি এখন শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

