জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের লড়াই ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। নিউইয়র্কে সংস্থাটির বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনকে সামনে রেখে বিশ্বনেতারা জড়ো হচ্ছেন, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই নিরাপত্তা পরিষদে গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়েছে তৃতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটি। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই গোপন ভোটে কোনো প্রার্থী স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারেননি। সভা শেষে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সভাপতি ও জাতিসংঘে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফন্ট শুধু জানান, খসড়া ভোটাভুটি সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি, তবে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এবার সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে গেছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান।
সূত্র অনুযায়ী, তৃতীয় দফার ভোটে গ্রিনস্প্যান পেয়েছেন ৯টি ‘উৎসাহিত করা’ ভোট, বিপরীতে ৫টি ‘নিরুৎসাহিত করা’ এবং ১টি ‘মতামত নেই’। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বার্কেট—তিনি পেয়েছেন ৮টি ইতিবাচক ও ৬টি নেতিবাচক ভোট। এর বাইরে উগান্ডার ওলারা ওতুন্নু, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি এবং সেনেগালের ম্যাকি স্যালও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রথম দুই দফার ভোটে গ্রিনস্প্যান ও রদ্রিগেজ-বার্কেটের মধ্যে পালাবদল ঘটেছে। জুলাইয়ের প্রথম ভোটে এগিয়ে ছিলেন গ্রিনস্প্যান, আগস্টের দ্বিতীয় ভোটে শীর্ষে ওঠেন রদ্রিগেজ-বার্কেট, আর তৃতীয় দফায় আবারও শীর্ষে ফিরলেন গ্রিনস্প্যান।
নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি সদস্য দেশ এবার একজন নারী মহাসচিব দেখতে চায় বলে ইতিমধ্যেই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। জাতিসংঘের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো নারী মহাসচিব হননি। এই নির্বাচনে গ্রিনস্প্যান ও রদ্রিগেজ-বার্কেট, উভয়েই শীর্ষ দুই অবস্থানে রয়েছেন, যা প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করছে। তবে সত্যিকারের বাধাটি রয়ে গেছে অন্য জায়গায়। মহাসচিব হতে হলে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদে অন্তত ৯টি ভোট পেতে হবে এবং পাঁচ স্থায়ী সদস্য, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার কেউ ভেটো দিতে পারবেন না। অথচ এই পাঁচ পরাশক্তির মধ্যে গভীর বিভক্তি ও মতবিরোধ বিরাজ করছে। গ্রিনস্প্যানের ৫টি নেতিবাচক ভোট এবং রদ্রিগেজ-বার্কেটের ৬টি নেতিবাচক ভোটই স্পষ্ট করে দিচ্ছে—কোনো এক স্থায়ী সদস্যের সমর্থন এখনো নিশ্চিত নয়।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এখনো বাকি। কয়েক দফা অনানুষ্ঠানিক ভোটের পর স্থায়ী পাঁচ সদস্যকে ভিন্ন রঙের সবুজ ব্যালট দেওয়া হবে। এই ব্যালটের উদ্দেশ্য হলো, কোনো স্থায়ী সদস্য কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছেন কি না, তা শনাক্ত করা। তবে কে ভেটো দিয়েছেন, তা গোপনই থাকবে। ঠিক কত দফা পর সবুজ ব্যালট দেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট নয় তাই এই অনিশ্চয়তা নির্বাচনের গতি ও ফলাফলকে প্রভাবিত করছে। একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে সবুজ ব্যালট দেওয়া হতে পারে, যা স্পষ্ট করে দেবে কে ভেটোর ঝুঁকিতে রয়েছেন এবং কে আসল দৌড়ে রয়েছেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর নাম না উল্লেখ করে বলেছেন, নতুন মহাসচিবকে অবশ্যই জাতিসংঘকে মূল লক্ষ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে—পাঁচ পরাশক্তির সমঝোতায় শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করেই কোনো নতুন ‘সমঝোতার প্রার্থী’ দৃশ্যপটে চলে আসতে পারেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক সতর্ক করে বলেছেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ঘটলে তা বড় সংকট তৈরি করবে। ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদে চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশই হবে সবচেয়ে বড় বাধা। সেই বাধা পার হতে না পারলে যতই জনপ্রিয়তা থাকুক, কোনো প্রার্থীর পক্ষেই মহাসচিব হওয়া সম্ভব নয়।
বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হচ্ছে এবং নতুন মহাসচিব ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন। সময় কমে আসছে দ্রুত, অথচ নিরাপত্তা পরিষদে ঐকমত্য এখনো অধরাই। প্রথম নারী মহাসচিবের ইতিহাস তৈরি হবে, নাকি শেষ মুহূর্তে কোনো অপ্রত্যাশিত নাম সামনে চলে আসবে, সে অপেক্ষায় গোটা বিশ্ব।

