নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) গৃহীত একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ং বলেছে, পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের যে অবস্থান তারা ঘোষণা করেছে, তা ‘অপরিবর্তনীয়’ এবং দেশটির পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা সেই অবস্থানকে সমর্থন করছে।
শনিবার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির (কেসিএনএ) প্রকাশিত বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ অবস্থান জানায়।
একই দিনে কেসিএনএকে দেওয়া পৃথক বক্তব্যে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং আইএইএর বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতদুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি’ ও ‘দ্বৈত নীতি’ অনুসরণের অভিযোগ করেন।
তার দাবি, আইএইএর এই দ্বৈত মানদণ্ড আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধব্যবস্থাকে দুর্বল করছে।
কিম ইয়ো জং অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘পারমাণবিক বিস্তার কার্যক্রম’ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পারমাণবিক সাবমেরিন আনার পরিকল্পনা’ নিয়ে আইএইএ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। অথচ উত্তর কোরিয়া যেসব পারমাণবিক কার্যক্রমকে ‘আত্মরক্ষামূলক ও বৈধ’ বলে দাবি করে, সেগুলোর বিরুদ্ধে সংস্থাটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।
আইএইএর প্রস্তাবকে গুরুত্ব দিচ্ছে না পিয়ংইয়ং
চলতি সপ্তাহে আইএইএর সাধারণ সম্মেলনে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। এর পর পিয়ংইয়ং অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাটিকে ব্যবহার করছে।
উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্যোগে তৈরি প্রস্তাব তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনবে না।
তবে আইএইএর অবস্থান ভিন্ন। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির সম্প্রসারণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলোর লঙ্ঘন। আইএইএ পরিদর্শকেরা ২০০৯ সাল থেকে উত্তর কোরিয়ায় সরাসরি যাচাই কার্যক্রম চালাতে পারেননি এবং সংস্থাটি মূলত স্যাটেলাইট ছবি ও উন্মুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেশটির পারমাণবিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
ফলে ‘পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র’ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার দাবি মূলত পিয়ংইয়ংয়ের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান; আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ কাঠামোর অধীনে এই মর্যাদা স্বীকৃত নয়।
অস্ত্র কারখানা পরিদর্শনে কিম
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন এই বিরোধের মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কিম জং উন চলতি সপ্তাহে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র উৎপাদন কারখানাগুলোতে তিন দিনের পরিদর্শন করেছেন।
পিয়ংইয়ং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই কিম নতুন একটি যুদ্ধজাহাজ উদ্বোধন করে এটিকে দেশের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পর দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা আরও গভীর হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধে মোতায়েন হওয়া উত্তর কোরীয় সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাও পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
কিম শুক্রবার পিয়ংইয়ংয়ে প্রচারকর্মীদের একটি প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানেও বক্তব্য দেন। কেসিএনএর তথ্য অনুযায়ী, তিনি বলেন, আধুনিক ‘মতাদর্শগত যুদ্ধ’ পুরোনো পদ্ধতির পুনরাবৃত্তির পরিবর্তে আরও উদ্ভাবনী, সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে সংলাপ চাইছেন ট্রাম্প
একদিকে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া নতুন করে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ দেখাচ্ছে।
শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপ চান এবং সম্ভাব্য আলোচনা সহজ করতে সিউল ভূমিকা রাখতে প্রস্তুত।
প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদে কিম জং উনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছিলেন ট্রাম্প। গত মাসে তিনি আবারও জানান, চলতি বছরের শেষ দিকে উত্তর কোরীয় নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।
ট্রাম্প একই সঙ্গে কিমের সঙ্গে ‘মিলেমিশে থাকা’ গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন এবং দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার হাতে এখন ৫৭টি ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। তবে এই সংখ্যা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়েও কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা কমেনি। ১২ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়া পূর্ব উপকূল থেকে কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করে বলে জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনী। এর ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়েছিল। পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের মহড়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
ফলে একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হলেও, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ না করার অবস্থান আরও কঠোর হচ্ছে। এই দুই বিপরীত প্রবণতার মধ্যেই কোরীয় উপদ্বীপের পরবর্তী কূটনৈতিক সমীকরণ নির্ধারিত হতে পারে।

