সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে গভীর রাতে একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এর কিছুক্ষণ আগেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ‘শত্রুপক্ষের বিমান হামলার হুমকি’ জানিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। সূত্র: এএফপি
শনিবার ভোররাত তিনটার কিছু আগে রিয়াদের বাসিন্দাদের মুঠোফোনে পাঠানো জরুরি বার্তায় বলা হয়, পুরো এলাকা ‘শত্রুপক্ষের বিমান, ড্রোন অথবা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির’ মধ্যে রয়েছে। নাগরিকদের দ্রুত ঘরের ভেতরে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই রিয়াদে অবস্থানরত এএফপির সাংবাদিকেরা দুটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ সতর্কতা প্রত্যাহার করে নেয়। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ওই হুমকির উৎস আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করেনি। ফলে বিস্ফোরণগুলো হুতি হামলা, সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বাধাদান কিংবা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চল ও বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে জুলাইয়ে লড়াই পুনরায় বড় আকার ধারণ করার পর এবারই প্রথম রাজধানী রিয়াদ সরাসরি এমন বিমান হামলার সতর্কতার মুখে পড়ল।
এর কয়েক দিন আগেই মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফেও সম্ভাব্য বিমান হামলার সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট মক্কার দিকে হুতিদের একটি ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ করলেও গোষ্ঠীটি সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
রিয়াদের সর্বশেষ ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটল, যখন সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে কয়েক বছর ধরে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকা পরিস্থিতি দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
ইয়েমেনের অধিকাংশ জনবহুল এলাকা আগে থেকেই হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। চলতি সেপ্টেম্বরে গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরের উপকূল বরাবর দ্রুত সামরিক অভিযান চালিয়ে মোখা বন্দরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশের দ্বীপ দখল করেছে।
এর ফলে ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল কার্যত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেবে তাদের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাব আল-মানদেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের জন্য এটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সংকীর্ণ পথগুলোর একটি।
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দেশটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানি করে সেখান থেকে বাব আল-মানদেব ব্যবহার করে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পাঠাতে পারে।
হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে। গোষ্ঠীটির দাবি, সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব উন্মুক্ত থাকবে।
হুতিদের এই অবস্থান সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানির ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে বাব আল-মানদেব হয়ে সৌদি তেল রপ্তানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে গত সপ্তাহেও তেলবোঝাই পাঁচটি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছে।
হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মানদেবেও চলাচল সীমিত হয়ে পড়লে সৌদি আরবের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পৌঁছানোর বিকল্প পথ আরও সংকুচিত হতে পারে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথ ঘিরে অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করছে।
সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনে নতুন করে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নতুন সংঘাতের কারণে এক লাখ ১২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন এবং প্রায় তিন হাজার মানুষ বিপজ্জনকভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী জিবুতিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) আরও হালনাগাদ হিসাবে, জুনে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এক লাখ ১৮ হাজার ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তাইজ ও লাহজ অঞ্চলে।
হুতিদের দ্রুত ভূখণ্ড দখল, সৌদি আরবে ক্রমবর্ধমান হামলা এবং বাব আল-মানদেবকে ঘিরে নতুন সামরিক বাস্তবতা—সব মিলিয়ে ইয়েমেনের সংঘাত এখন আর কেবল দেশটির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রিয়াদে সর্বশেষ বিমান হামলার সতর্কতা ও বিস্ফোরণ সেই সংঘাত সৌদি আরবের কেন্দ্রস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর নতুন ইঙ্গিত হয়ে উঠেছে।

