সুইজারল্যান্ডের খাদ্য ও পানীয় জায়ান্ট নেসলে এবং ফ্রান্সের খুচরা বিক্রেতা অশাঁনের রাশিয়ায় থাকা ব্যবসা সাময়িক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ক্রেমলিন। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর মস্কোর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ধারাবাহিকতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সূত্র: সিএনএন
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ১৭ সেপ্টেম্বর এক ডিক্রিতে প্রতিষ্ঠান দুটির রুশ সম্পদ স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এলইভি ম্যানেজমেন্টের সাময়িক ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরদিন শুক্রবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, নেসলে ও অশাঁন এমন ইউরোপীয় দেশের প্রতিষ্ঠান, যেগুলোকে মস্কো ‘বন্ধুত্বহীন’ হিসেবে বিবেচনা করে। এসব দেশের রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে পেসকভ স্পষ্ট করেন, আপাতত প্রতিষ্ঠান দুটির সম্পদ শুধু সাময়িক বাহ্যিক ব্যবস্থাপনায় দেওয়া হয়েছে; মালিকানা পরিবর্তনের বিষয়ে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
কিটক্যাট, নেসক্যাফেসহ বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয় পণ্যের উৎপাদক নেসলে জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে এবং সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।
প্রতিষ্ঠানটির রাশিয়ায় ছয়টি কারখানা রয়েছে। সেখানে কফি, পোষা প্রাণীর খাবার ও শিশু খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয় এবং সাত হাজারের বেশি মানুষ কর্মরত রয়েছেন।
২০২১ সালে রাশিয়ায় নেসলের বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি সুইস ফ্রাঁ বা প্রায় ২৪০ কোটি ডলার, যা ওই সময় প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক বিক্রির প্রায় ২ শতাংশ ছিল। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ব্যবসার পরিসর কমিয়ে দেওয়ায় বর্তমানে রাশিয়া থেকে আসা বিক্রির অংশ আরও কমেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
নেসলে এক বিবৃতিতে বলেছে, নিজেদের অধিকার রক্ষা এবং ব্যবসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষ করে কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সম্পদ নিয়ন্ত্রণের খবর প্রকাশের পর জুরিখের শেয়ারবাজারে নেসলের শেয়ারের দাম প্রায় ২ শতাংশ কমে যায়।
ফরাসি খুচরা বিক্রেতা অশাঁন রাশিয়ায় খাদ্যপণ্য, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি করে।
প্রতিষ্ঠানটির রাশিয়ায় প্রায় ২৩০টি দোকান রয়েছে এবং অনলাইন ব্যবসাও পরিচালনা করে। সেখানে প্রায় ৩০ হাজার কর্মী কাজ করেন বলে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে সিএনএন ও রয়টার্স।
অশাঁনের রুশ শাখা জানিয়েছে, পুতিনের ডিক্রির বিষয়ে তারা বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে। তবে আপাতত তাদের দোকান ও অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। অসংখ্য পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান রাশিয়া ছেড়ে যায় বা ব্যবসার পরিসর কমিয়ে দেয়।
এরপর ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট পুতিন এমন একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে ‘বন্ধুত্বহীন’ দেশের মালিকানাধীন সম্পদ সাময়িক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষমতা পায় রুশ সরকার।
এই ব্যবস্থার আওতায় এর আগে ফ্রান্সের দই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান দানোন এবং ডেনমার্কের বিয়ার প্রস্তুতকারী কার্লসবার্গের রুশ ব্যবসাও সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল মস্কো। পরবর্তী সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তর বা বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে।
এ কারণে নেসলে ও অশাঁনের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাময়িক ব্যবস্থাপনার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশ্লেষক। অতীতের নজির অনুযায়ী, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বাধ্যতামূলক বিক্রি বা মালিকানা পরিবর্তনের পথও তৈরি করতে পারে। তবে নেসলে ও অশাঁনের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর নেসলে রাশিয়ায় পণ্যের পরিসর, বিনিয়োগ, বিজ্ঞাপন এবং অপ্রয়োজনীয় আমদানি-রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
তবে পুরোপুরি রাশিয়া ছাড়েনি প্রতিষ্ঠানটি। এ সিদ্ধান্তের জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিসহ বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার মুখে পড়ে নেসলে।
নেসলে বলে আসছে, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের জন্যই সীমিত আকারে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত করা রুশ কার্যক্রম থেকে মুনাফা করাই তাদের উদ্দেশ্য নয়।
রাশিয়ায় সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির প্রবণতা শুধু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশীয় বেসরকারি সম্পদের ওপরও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বেড়েছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর এত বড় পরিসরে সম্পদ পুনর্বণ্টনের নজির দেখা যায়নি।
বার্লিনভিত্তিক কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক আলেক্সান্দ্রা প্রোকোপেঙ্কো নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন, রাশিয়ার প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয় ১৯৯০-এর দশকের বেসরকারীকরণ চুক্তিগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করছে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কিছু সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই সিদ্ধান্ত এমন সময় এলো, যখন রাশিয়ায় তিন দিনের স্টেট ডুমা নির্বাচন চলছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
ক্রেমলিনসমর্থিত ইউনাইটেড রাশিয়া পার্টি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর বিধিনিষেধ ও নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
নেসলে ও অশাঁনের সম্পদ সাময়িক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘটনাটি তাই শুধু দুটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সংকট নয়; ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার অর্থনীতি, বিদেশি বিনিয়োগ ও বেসরকারি সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কীভাবে বদলে যাচ্ছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

